অ্যান সেক্সটন মার্কিন কাব্যজগতের অন্যতম উজ্জ্বল কবি। ১৯৬৭ সালে তাঁর পাঠকনন্দিত কাব্যগ্রন্থ লিভ অর ডাই-এর জন্য বিখ্যাত ও পুলিৎজার পুরস্কারে সম্মানিত। তাঁকে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উদ্ভাবিত আধুনিক স্বীকারোক্তিমূলক কাব্যধারার কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ছাড়া এই ধারার উল্লেখযোগ্য কবিরা হলেন– রবার্ট লোয়েল, সিলভিয়া প্ল্যাথ, জন বেরিম্যান ও ডব্লিউ. ডি. স্নডগ্রাস। এসব কবি কোনোরকম জড়তা দেখাননি কিংবা সমাজের নিয়মকানুনকে ভয় করেননি, বরং প্রতিকূল পরিবেশকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যক্তিজীবনের গভীর এবং স্পর্শকাতর বিষয় বা ঘটনা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তারা কবিতায় নিজেদের অভিজ্ঞতা, আবেগ এবং সংগ্রাম খোলাখুলিভাবে পাঠকের সামনে প্রকাশ করেছেন। আলাদা ঘরানার সাহসী কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও অ্যান সেক্সটন হতাশা, আত্মমূল্যহীনতা এবং আবেগগত অস্থিতিশীলতায় প্রায় সারাজীবন অসুস্থ ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ দিনের মানসিক অসুস্থতা তাঁকে মধ্য বয়সে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়েছিল। জীবন ও সাহিত্য অ্যান সেক্সটন (জন্মনাম অ্যান গ্রে হার্ভে) ১৯২৮ সালের ৯ নভেম্বর ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের নিউটন এলাকার এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শৈশবের বেশির ভাগ সময় বোস্টনে কাটিয়েছেন। কৈশোর ছিল ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক চ্যালেঞ্জপূর্ণ, যার মধ্যে অন্যতম বিষয় বা ঘটনা ছিল মায়ের সঙ্গে তাঁর জটিল সম্পর্ক এবং অল্প বয়সে পিতার মৃত্যু। শৈশবে অ্যান সেক্সটন পিতামাতার কাছ থেকে অবাঞ্ছিত হওয়ার কঠিন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। যেমন তাঁর বয়স এগারো বছর হওয়া পর্যন্ত বাবা তাঁকে রাতের খাবারের সময় আলাদা টেবিলে বসতে বাধ্য করেছেন। এ ছাড়া তাঁর জীবনীকার ডায়ান মিডলব্রুকের মতে, সম্ভবত তিনি ছোটবেলায় যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। শুরুতে তাঁর স্কুলজীবন কঠিন ছিল। তাই ১৯৪৫ সালে বাবা-মা তাঁকে ম্যাসাচুসেটসের এক বোর্ডিং স্কুলে পাঠান। সেখানেই তিনি কবিতা লেখা এবং অভিনয় শুরু করেন। পরে তিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে যান, কিন্তু জীবনের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যতের উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে রীতিমতো সংগ্রাম করেন। তিনি উনিশ বছর বয়সে (১৯৪৮ সালের ১৬ আগস্ট) আলফ্রেড মুলার সেক্সটন দ্বিতীয় (ডাকনাম কায়ো)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন। তাদের দুই কন্যাসন্তান ছিল। ১৯৭৩ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। একসময় তাঁর মধ্যে মানসিক অসুস্থতা প্রবল হয়ে ওঠে এবং তাঁকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। তখন থেকে তিনি মানসিক যন্ত্রণা এবং আবেগতাড়িত কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মদ্যপান এবং শক্তিশালী ওষুধ সেবন করা শুরু করেন। তারপর বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট, ঘুমের বড়ি এবং ট্রাঙ্কুলাইজারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। আর এসব অভ্যাস তাঁর সৃষ্টিশীলতার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অ্যান সেক্সটনের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অল মাই প্রিটি ওয়ানস (১৯৬২), লাইভ অর ডাই (১৯৬৬), মার্সি স্ট্রিট (১৯৬৯), লাভ পোয়েমস (১৯৬৯), ট্রান্সফরমেশনস (১৯৭১), দ্য বুক অব ফলি (১৯৭২) ও দ্য ডেথ নোটবুকস (১৯৭৪)। এ ছাড়া তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে নির্বাচিত এবং সংকলিত কয়েকটি গ্রন্থ। যেমন– ৪৫ মার্সি স্ট্রিট (১৯৭৬), অ্যান সেক্সটন: এ সেল্ফ-পোর্ট্রেট ইন লেটার্স (১৯৭৭), আনকালেক্টেড পোয়েমস উইথ থ্রি স্টোরিজ (১৯৭৮) ও নো ইভিল স্টার: সিলেক্টেড এসসেইস, ইন্টারভিউস, অ্যান্ড প্রোজ (১৯৮৫)। কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও তিনি কবি ম্যাক্সিন কুমিনের সঙ্গে যৌথভাবে শিশুসাহিত্যের কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন। যেমন– এগস অব থিংস (১৯৬৩), জোয়ি অ্যান্ড দ্য বার্থডে প্রেজেন্ট (১৯৭১) ও দ্য উইজার্ড’স টিয়ার্স (১৯৭৫)। পুলিৎজার পুরস্কারের পাশাপাশি অ্যান সেক্সটন আরও কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার এবং ফেলোশিপ পেয়েছেন, যেমন গুগেনহাইম ফেলোশিপ, শেলি মেমোরিয়াল প্রাইজ (১৯৬৭), লেভিনসন প্রাইজ (১৯৬২), রবার্ট ফ্রস্ট ফেলোশিপ, রয়েল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পাই বেটা ক্যাপ্পা’-র প্রথম মহিলা সদস্য ছিলেন এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটি এবং কলগেট ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছেন। কবে, কোথায় ও কীভাবে আত্মহত্যা করেছেন ১৯৭৪ সালের ৪ অক্টোবর। দিনটি ছিল শুক্রবার। দুপুরে অ্যান সেক্সটন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি ম্যাক্সিন কুমিনের সঙ্গে খাবার খেয়ে তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ (দ্য অফুল রোয়িং টুয়ার্ড গড) নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা ১৯৭৫ সালের মার্চে প্রকাশিত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সেদিন রাতেই অ্যান সেক্সটন তাঁর মায়ের পুরোনো পশমের কোট গায়ে জড়িয়ে হাতের আঙুলের সবক’টি আংটি খোলেন। তারপর তিনি গ্লাসে ভদকা ঢেলে পান করেন এবং অবশেষে গ্যারেজে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করেন। অবশেষে গাড়ি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় তিনি মারা যান। তাঁর তার বয়স ছিল ৪৫ বছর। অ্যান সেক্সটনের আত্মহত্যা হয়তো তাঁর বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের জন্য দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক ছিল, তবে তা মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। কেননা আগেও তিনি কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, তবে সফল হতে পারেননি। যাহোক, তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু সাহিত্য জগতে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল এবং পরিবার, বন্ধু ও ভক্তদের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। অ্যান সেক্সটনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছিল ম্যাসাচুসেটসের ডেডহ্যামে অবস্থিত সেন্ট পল গির্জায়। পরে তাঁর মরদেহ বোস্টনের ফরেস্ট হিলস গোরস্তানে সমাহিত করা হয়। অ্যান সেক্সটন আত্মহত্যার চিরকুট (সুইসাইড নোট) রেখে গিয়েছেন, যা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সময়ে লেখা হয়েছিল। অ্যান সেক্সটনের আত্মহত্যার পেছনে অনেক কারণ ছিল। যেমন– তীব্র বিষণ্নতা, মদ্যপান ও মাদক সেবন, ব্যক্তিগত আঘাত এবং দীর্ঘ দিনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে তাঁর লড়াই শুরু হয়েছিল প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শুরুতে। মেয়েদের জন্মের পর তিনি অবসাদে ভুগেছিলেন। ১৯৭০-এর দশকে তাঁর মানসিক সমস্যাগুলো আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং বিবাহবিচ্ছেদ তাঁর মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। উত্তরাধিকার অ্যান সেক্সটনের জীবন দুঃখজনকভাবে মধ্য বয়সে শেষ হয়েছিল, কিন্তু আত্মঘাতীর পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পরেও তিনি আধুনিক স্বীকারোক্তিমূলক কবি হিসেবে পাঠক ও লেখকদের মধ্যে এখনও স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা তাঁকে সাহিত্য জগতে স্থায়ী আসনে স্থান দিয়েছে এবং সমসাময়িক কবিতায় প্রভাব ফেলেছে। কেননা, তাঁর কবিতা আজও ব্যক্তিগত ব্যথা-বেদনা, ট্রমা এবং মানসিক অসুস্থতার কারণ খোঁজার জন্য অধ্যয়ন এবং গবেষণা করা হয়। এ কথা বলা যায় যে, অ্যান সেক্সটনের স্বীকারোক্তিমূলক লেখার ধারা ভবিষ্যতের কবিদের জন্য পথ প্রশস্ত তৈরি করে রেখেছে, যারা ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও মানস জগতের টানাপোড়েন সম্পর্কে খোলাখুলি লিখতে চায়। অ্যান সেক্সটনের আত্মহত্যা অনেক সংগ্রামী ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার গুরুত্ব এবং বিষণ্ণতা ও অন্যান্য মানসিক অসুখ সম্পর্কে উন্নত সহায়তা ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম মানসিক স্বাস্থ্য ও সৃজনশীলতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় অনুপ্রেরণা জাগায় এবং তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু ঠিকমতো চিকিৎসা না পাওয়া মানসিক অসুখের ভয়ানক পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেয়। কবিতার বাইরে অ্যান সেক্সটনকে নারীবাদী প্রতীক হিসেবেও মনে করা হয়। নারী যৌনতা, পরিচয় এবং মহিলাদের ওপর চাপ নিয়ে তার অনুসন্ধান ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। তাঁর কবিতা আজও নারীবাদী লেখক ও গবেষকদের প্রভাবিত করে এবং যারা একই ধরনের সমস্যার সঙ্গে লড়ছেন, তাদের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। অ্যান সেক্সটনের নাটক ‘মার্সি স্ট্রিট’ ও ‘৪৫ মার্সি স্ট্রিট’ কবিতা পড়ে পিটার গ্যাব্রিয়েল অনুপ্রাণিত হন এবং তাঁর গান ‘মার্সি স্ট্রিট’ ১৯৮৬ সালের অ্যালবাম ‘সো’ কবিকে উৎসর্গ করেন। দ্য স্মিথস-এর সাবেক সংগীতশিল্পী ও গীতিকার মরিসি অ্যান সেক্সটনকে ‘ব্যক্তিগত স্পর্শবিন্দু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া তাঁকে বোস্টন উইমেন্স হেরিটেজ ট্রেইলে স্মরণ করা হয়েছে। শেষকথা একজন সাহসী কবি হিসেবে সাফল্যের পরেও অ্যান সেক্সটনের জীবন ছিল গভীর দুঃখ এবং অস্থিরতায় পূর্ণ। তাঁর মৃত্যু ছিল হৃদয়বিদারক এবং মর্মান্তিক ঘটনা, যা বছরের পর বছর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, মাদকাসক্তি এবং আবেগগত চাপের পুঞ্জীভূত বিস্ফোরণ। তাই তাঁর আত্মহত্যা কোনো পৃথক ঘটনা ছিল না। এ কথা সত্যি যে, অ্যান সেক্সটনের জীবন এবং স্বীকারোক্তিমূলক সাহিত্যকর্ম আজও পাঠকদের মন স্পর্শ করে এবং মার্কিন কবিতায় তাঁর প্রভাব গভীরভাবে মিশে আছে।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]