কক্সবাজারের মাতামুহুরীতে গত মৌসুমে উৎপাদিত লবণ। গতকাল ডেবডেবি এলাকায় সমকাল
কক্সবাজারের মাতামুহুরী উপজেলার পশ্চিম বড়ভেওলা এলাকার ৬০ একর জমিতে গত মৌসুমে লবণ উৎপাদন করেন হারুনুর রশিদ। তিনি পাশের চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। উৎপাদনে ৭০ লাখ টাকা খরচ করেও তুলতে পেরেছেন ৪০ লাখের মতো। সব মিলিয়ে হারুনুর রশিদের লোকসান হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এরই মধ্যে গত বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এতে হারুনুর রশিদের মতো হাজারো লবণ উৎপাদক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার হারুনুর রশিদ বলেন, প্রতি বস্তা (৮০ কেজি) লবণ তিনি বিক্রি করেছেন ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। সঙ্গে ১৫০ টাকা পরিবহন খরচ হয়ছে। গত বছরের মতো লবণে তাঁর এত বেশি লোকসান কখনও হয়নি। একই তথ্য জানিয়ে রামপুরের নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁর জমিতে প্রায় ৫০ টন লবণ অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একইভাবে চকরিয়ার বহলতলী মৌজার মিজানুর রহমান চৌধুরীর জমিতে গত তিন মৌসুমের প্রায় ৫০ টন লবণ পড়ে আছে। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ১০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করে তাঁর ৫০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। মাতামুহুরীর বদরখালীর নুরুন নবীর ভোগান্তি আরও ভয়াবহ। ৩০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদনের জন্য নিজের পুঁজির সঙ্গে ব্যাংকের ঋণও খাটিয়েছেন। ৮০ লাখ টাকা লোকসান গুনে হতাশ এই চাষি জানালেন, ব্যাংকের ঋণ তিনি পুরো শোধ করতে পারেননি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলা ও পাশের চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে গত মৌসুমে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করা হয়। তাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছিল ২৬ লাখ ৭৫ হাজার টন। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন হয় ১৯ লাখ ৩৫ হাজার টন। গত মৌসুমে উৎপাদনে ঘাটতি ছিল প্রায় ৭ লাখ টন লবণ। তবে উৎপাদিত লবণের মধ্যে মাঠে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে চার লাখ টন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির নেতাদের তদবিরে বিসিক চলতি বছরের মাঝামাঝি লবণ আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে। গত বুধবার মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেয়। এতে ২৪৪টি লবণ মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট এক লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন ও ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে উৎপাদনকারী সাত প্রতিষ্ঠানকে দুই হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়।
এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ১০টি উপজেলার লবণ চাষে জড়িত দেড় লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, মাঠের প্রকৃত অবস্থা না জেনে লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে লবণ চাষি ও চাষের ওপর নির্ভরশীল প্রায় দেড় লাখ মানুষ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থার মধ্যে আগামী ডিসেম্বরে অনেক চাষিই লবণ উৎপাদনে নামবেন না। মাতামুহুরীর লবণ চাষি শোয়াইবুল ইসলাম সবুজ ও রামপুরের নজরুল ইসলামের ভাষ্য, গত জুনে যখন মাতামুহুরী উপজেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, তখন তিনি লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের আশ্বাস দেন। এর পরও বিসিকের সুপারিশে লবণ ঘাটতির আশঙ্কা দেখিয়ে আমদানির অনুমতি রহস্যজনক। মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান জামিল ইব্রাহিম চৌধুরীর ভাষ্য, গত বছর চাষিরা মাঠে লবণ বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেননি। তারপরও পৈতৃক পেশা ধরে রাখতে জমি লাগিয়ত নিয়ে ডিসেম্বরের শেষ দিকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। হঠাৎ লবণ আমদানির অনুমতির খবরে তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত বুধবার লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন বিসিক কক্সবাজারের পরিদর্শক ইদ্রিস মিয়া। তাঁর ভাষ্য, মাঠে প্রায় চার লাখ টন লবণ অবিক্রীত পড়ে আছে। গত মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে ১৫ দিন আগে চাষিদের মাঠ ছাড়তে হয়। তারা লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ই-মেইল: [email protected], [email protected]