মুফতী সালাহউদ্দিন (পটুয়াখালী) ও আসাদুজ্জামান মিরাজ (কুয়াকাটা)
পর্যটননগরী কুয়াকাটা পৌরসভায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট নিরসনে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না পৌরবাসী। আগের ৩৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকার প্রকল্পটির সুফল না পেতে ভেস্তে গেছে পুরো উদ্যোগ। তা সত্ত্বেও নতুন করে আবার ৪৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চার বছর আগে শেষ হওয়া প্রথম প্রকল্পটি থেকে আজ পর্যন্ত এক ফোঁটাও সুপেয় পানি পাননি পৌরবাসী। বরং উদ্বোধনের আগে পাম্প বিকল হয়ে গেছে এবং চুরি হয়ে গেছে মূল্যবান যন্ত্রাংশ। আগের প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত না করে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা সরকারের আর্থিক অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর ৮ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে গঠন করা হয় ‘গ’ শ্রেণির কুয়াকাটা পৌরসভা। এখানে প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দা বসবাস করেন। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে আরও অন্তত ১০ হাজার পর্যটক আগমন করেন। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, বর্ষবরণ, থার্টিফার্স্ট নাইট ও রাস মেলাসহ বিভিন্ন উৎসবে পর্যটকের এই সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে কুয়াকাটার বাসিন্দা ও পর্যটকদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপদ সুপেয় পানির সংকট।
এই সংকট দূর করতে ২০১৮ সালে ৩৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, যা ২০২১ সালের নভেম্বরে বাস্তবায়িত হয়। প্রকল্পের আওতায় ৩টি উৎপাদক নলকূপ, ১০ কিলোমিটার পাইপলাইন, ৮টি পাবলিক টয়লেট ও ৫৮০টি গৃহসংযোগ দেওয়ার কথা ছিল। প্রকল্প শেষ হওয়ার চার বছর পার হলেও নিরাপদ পানি পাননি পৌরবাসী। গত ৭ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তুলাতলী পয়েন্টের পাম্প হাউসে কোনো যন্ত্রপাতি নেই। পরিত্যক্ত সেই ভবনে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন স্থানীয় এক মাদ্রাসা শিক্ষক। পাম্প ভবনে বসবাসকারী মুহাম্মদ নাইমুর রহমান নামের ওই শিক্ষক বলেন, ‘আমি পৌরসভার অনুমতি নিয়ে বিনা ভাড়ায় এখানে দুই বছর ধরে সপরিবারে বসবাস করছি। শুনেছি ভবনের ভেতরে মোটর ও বিদ্যুতের বোর্ড ছিল, এখন আর কিছু নেই। এ পাম্প থেকে কোনো পানি সরবরাহ হচ্ছে না।’
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, চালুর আগে বিভিন্ন পাম্পের মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও পাইপলাইন চুরি হয়ে গেছে। তারা জানান, পানি সরবরাহের জন্য তিনটি কার্যালয় করা হলেও একটিরও কার্যকর কোনো অস্তিত্ব নেই। দুই বছর আগে লাইন টানা হলেও তা কোনো কাজে আসেনি। উপরন্তু, চাকরি ও আর্থিক সুবিধার আশ্বাসে জমি দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন স্থানীয় আব্দুল হালিম ও সাবেক প্যানেল মেয়র পান্না মিয়া হাওলাদার। ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিক আব্দুল হালিম বলেন, ‘চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে পাঁচ বছর আগে আমার কাছ থেকে তিন শতাংশ জমি নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও পাম্পটি চালু হয়নি। আমি জমির মূল্য ও চাকরি পাইনি। একদিকে সম্পদ হারিয়েছি, অন্যদিকে বেকারই রয়ে গেলাম।’
কুয়াকাটা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র পান্না মিয়া হাওলাদার বলেন, ‘কুয়াকাটায় সুপেয় পানির বড়ই অভাব ছিল। পানির সংকট দূর করতে তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হলে আমরা এলাকাবাসী ১ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত জমি দান করি। তবে তা ছিল মৌখিক, এখনও দলিল করা হয়নি। পাম্পের জন্য তৈরি ভবনটি রেকর্ডীয় সম্পত্তিতে নির্মিত। জনস্বার্থে জমি দিলেও আজও পানি সরবরাহ করা হয়নি।’ এদিকে, ‘নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ’ নামের নতুন ৪৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকার প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে আগের প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় জনস্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা পৌরসভা–কেউই নিতে রাজি নয়। কুয়াকাটা পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী নিয়াজুর রহমান বলেন, ‘এ প্রকল্পের কাজ আমাদের নয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের। তারা নিজেরা প্রকল্পের ব্যয় এবং কাজের অগ্রগতির বিষয়ে বলতে পারবে। দুটি প্রকল্প তারা করছে, আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।’ তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি ভিন্ন। কলাপাড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘২০২১ সালের নভেম্বরে প্রকল্প সচল অবস্থায় পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তৎকালীন মেয়র তা বুঝে নেন। এ সবের যাবতীয় দাপ্তরিক প্রমাণাদি সংরক্ষিত রয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতেই এসব কথা বলছে।’ নতুন প্রকল্পের ব্যাপারে তিনি জানান, ‘নতুন প্রকল্পটি ২০২৪ সালে শুরুর কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় কাজ কিছুটা দেরিতে শুরু হয়। বর্তমানে নতুন প্রকল্পের ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’ পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘পানি সরবরাহ না হওয়ার অভিযোগ পেয়ে আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি যে, কাগজ-কলমে প্রদেয় তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করে পৌরসভার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা গ্রহণও করেছে।’