বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে সরকারের করণীয় নিয়ে গত ২০ জুলাই রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট (ডেইলি স্টার)। স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত শিক্ষানুরাগী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সৎ ও স্বনামধন্য সমাজসেবক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসক এবং অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিককে এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না– সরকারের কাছে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিই স্বয়ম্ভু নয়। কারও কোনো আনুকূল্য ছাড়া এমনি এমনি তা গড়ে ওঠেনি। ব্যক্তি বা এলাকার সর্বস্তরের মানুষের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একেকটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি পদাধিকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা আমলাদের আগ্রহেও অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালের আগে জমিদারদের অর্থানুকূল্যে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সরকার থেকে মাঝে মধ্যে অনুদান জুটত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় স্থানীয় উদ্যোগী লোকদের নিয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠিত হতো। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ ও প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও মেরামত– সবই ছিল ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বে। পুরোনো আমলে এসব ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি থাকতেন পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক, মহকুমা প্রশাসক বা তাদের প্রতিনিধি। সেক্রেটারি হতেন ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের একজন। অভিভাবক সদস্য নির্বাচিত হতেন অভিভাবকদের ভোটে; থাকতেন দাতা সদস্য, শিক্ষকদের ভোটে শিক্ষক প্রতিনিধি। মজার ব্যাপার হলো, এই ভূখণ্ডে যখন প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল না, তখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছেন।

স্বাধীনতার পর আসে পরিবর্তন। ১৯৭৪ সালে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। শিক্ষক-কর্মচারীরা আসেন সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায়। ক্রমে ১৯৮৪ সাল থেকে উচ্চ বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজগুলো আসে সরকারি আনুকূল্যের আওতায়। শুরু হয় এমপিওভুক্তি, শিক্ষকদের বেতনের দায় চলে যায় সরকারের খাতে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেলে নতুন ভবন হয়। শিক্ষকদের বেতন জোটানোর জন্য প্রতিষ্ঠাতা বা ম্যানেজিং কমিটিকে নাকাল হতে হয় না। অর্থাৎ এখনকার কমিটিকে অর্থায়ন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, তবে কর্তৃত্ব বজায় থাকে প্রায় ষোলআনা। শিক্ষক নিয়োগে কর্তৃত্ব না থাকলেও শিক্ষকদের হয়রানি ও সাময়িক বরখাস্তের নামে মানসিক নির্যাতনের এখতিয়ার থাকে তাদের হাতে। এমপিও প্রথা চালু হওয়ার পর শুরু হয় আরেক প্রবণতা। কোনোমতে একটা স্কুল, মাদ্রাসা বা কলেজ দাঁড় করিয়ে কোনো উপায়ে এমপিওভুক্তি হাসিল করলেই কেল্লা ফতে। এর ফলে এমন বহু প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষক বেশি।

এই মুহূর্তে দেশে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে এমন কলেজ ও মাদ্রাসার সংখ্যা আট হাজার ১৮০ এবং আসন সংখ্যা ২৬ লাখ এক হাজার ৭৭৯ (প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর)। এবারের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে যথাক্রমে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন ও এক লাখ ৬৫ হাজার ৫২ জন। মোট ১৩ লাখ আট হাজার ৫১৪ জন। এদের সবাই যদি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় তাহলেও আসন ফাঁকা থাকবে ১৩ লাখের কাছাকাছি। এমনকি এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় সব পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও উচ্চ মাধ্যমিকে চার লক্ষাধিক আসনে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যেত না। নিশ্চিত করে বলা যায়, যদি ম্যানেজিং কমিটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনসহ আনুষঙ্গিক ব্যয়ভার বহন করতে হতো তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রতিষ্ঠা পেত না বা বিলুপ্ত হয়ে যেত।

দেশে এখন তিন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে। একটি ধারা সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তাবৎ দেখভালের দায়িত্ব সরকারের। এমনকি অবসরের পর শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনও। দ্বিতীয় ধারাটি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষক- কর্মচারীরা সরকারি কর্মচারী নন, তবে বেতন-ভাতা পান সরকারি খাত থেকে। অবসরের পর আনুতোষিক ভাতা পান, কিন্তু পেনশন পান না। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অদম্য চেষ্টা থাকে সরকারীকরণের। এর মূল কারণ পেনশনপ্রাপ্তি। সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীকে যত দ্রুত সম্ভব সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনলে তাদেরও অবসরের পর পেনশনের সুরাহা হয়। তৃতীয় ধারা হচ্ছে এমপিওভুক্ত নয় এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে একটি বড় স্রোত এমপিওভুক্তির জন্য অদম্য চেষ্টারত; আর ছোট একটি স্রোত কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা ম্যানেজিং কমিটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে পরিচালিত হয়ে আসছে।

যারা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন; প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের দরদ থাকে অন্য রকম– এটা অস্বীকারের উপায় নেই। এসব প্রতিষ্ঠাতা হতে পারেন রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে তারা হয়ে থাকেন প্রভাবশালী। কারণ এই বিশাল ভার কোনো সাধারণের পক্ষে সামলানো দুঃসাধ্য। সালওয়ারি হিসাবে বাংলাদেশে ১৯৪৮ ও ১৯৭২ সালে অধিক হারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৭-এর পরে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠা করার মতো উদ্যম জমিদারদের ছিল না। এই দুই সময়ে ও তারপরে যত মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে, তার অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতৃত্বের আনুকূল্যে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে বিদ্যানুরাগী ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দ্বারাও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব বিদ্যানুরাগী ধনাঢ্য ব্যক্তির কতজন যে রাজনীতি-বহির্ভূত, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া দুষ্কর। আবার স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত শিক্ষানুরাগী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সৎ ও স্বনামধন্য সমাজসেবক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসক এবং অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিক একেবারেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন– এমনটাও দাবি করা অন্তত বাস্তবানুগ নয়।