কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে সামনে এসেছে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি। পুলিশ এই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা কোটবাড়ি কেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং ‘কেবিজি গ্রুপ’

পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলার সজীব হোসেন নিহত হন। তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কিশোর গ্যাং নয়ন বন্ডের সদস্যরা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই অমৃত মজুমদার গতকাল সমকালকে জানান, এই মামলায় কিশোর গ্যাং সদস্য নয়ন বন্ডসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, চলতি বছরে কিশোর গ্যাংয়ের ৭৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ছিনতাই ও চুরির অভিযোগে আরও ৪১৫ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের অধিকাংশই কিশোর।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কুমিল্লা নগরী ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। নগরীতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির সংঘর্ষ এবং ২০২৫ সালে মহড়ায় আসে রতন ও ঈগলের নাম। গত ২৫ এপ্রিল রানীর দিঘিরপাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় মহড়া দেয়। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ মে নাহিদ নামে কুমিল্লা জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে হাত ও পায়ের রগ কেটে আহত করেছে ‘আরজিএস’ নামে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর অটোরিকশা ছিনতাই করতে দাউদকান্দি উপজেলার শাহপুর গ্রামের স্কুলছাত্র আশ্রাফুল আমিনকে খুন করে। এই ঘটনায় ২৯ সেপ্টেম্বর কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের বাশরা গ্রামে রাহেজুল আমিন বাঁধনকে কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা। পুলিশ জানায়, কনস্টেবল হিসেবে নোয়াখালী জেলা পুলিশে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন অভিযোগে ঘটনার প্রায় দুই বছর আগে বাঁধনকে বরখাস্ত করা হয়। এলাকায় তিনি একটি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতেন। একই বছর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ।

গত ২ এপ্রিল ধর্মসাগর পাড়ে বেড়াতে যান কোতোয়ালি থানার কনস্টেবল জাকিয়া সুলতানা এবং তাঁর স্বামী চাঁদপুরে কর্মরত কনস্টেবল কাজী আব্দুল্লাহ মো. জোবায়ের। সেখানে তিন কিশোর গ্যাং সদস্য জাকিয়াকে লক্ষ্য করে আশালীন মন্তব্য করেন। প্রতিবাদ করায় তাঁর স্বামীকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন রিফাত ও সিয়াম নামে দুই কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিযান থেমে নেই। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িতদের নতুন তালিকা করা হচ্ছে।

আলোচনায় তিন ডজন কিশোর গ্যাং কুমিল্লা নগরী, সদর দক্ষিণ থানা ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় আছে অন্তত ৩৬টি কিশোর গ্যাং। একটি সূত্র বলছে, কোটবাড়ি এলাকায় কেবিজি, ফ্লাইং বার্ড ও জেআর নামে তিনটি কিশোর গ্যাং বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। স্কুলের ছাত্রদের বিভিন্ন প্রলোভনে তাদের গ্রুপে টানা হতো। স্কুলছাত্র অপ্রমিতকেও টার্গেট করে গ্রুপে টানে তারা। সদর দক্ষিণ থানার ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলামের ভাষ্য– অপ্রতিম হত্যায় এই পর্যন্ত গ্রেপ্তার চারজন ছাড়াও কেউ জড়িত কিনা তদন্ত করা হচ্ছে। এদিকে গতকাল শনিবার অপ্রতিম হত্যা মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক রাজিব আহমেদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন লোকজনের বক্তব্য নেন এবং আলামত সংগ্রহ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর স্কুলছাত্র অপ্রতিমকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে একরাতে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নিয়ে ৪৫১ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন অপরাধে ১৭৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না। পুলিশ কিশোর গ্যাংবিরোধী যে অভিযান শুরু করেছে তা অব্যাহত রাখা হবে।

ছাত্রদলের মিছিলে কিশোর গ্যাং লিডার কুমিল্লায় মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের পেছনে মিছিলে আলোচিত কিশোর গ্যাং লিডার ইমরান হোসেন রতনের একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে এই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ছবিতে দেখা গেছে, মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিন একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর পেছনের আলোচিত রতন গ্যাংয়ের প্রধান মো. রতন তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মিছিল করছেন। ছাত্রদল নেতা মহসিন বলেন, ‘আমি গ্যাং লিডার রতনকে চিনি না। স্বেচ্ছাসেবক দলের মিছিলে কীভাবে সে আমার পেছনে দাঁড়িয়েছে, তা আমি বলতে পারব না। ছাত্রদল কিশোর গ্যাং কালচার সমর্থন করে না।’