লেখক ও গবেষক আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বর্তমানে ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক এবং নাগরিক সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৪
সমকাল: উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীর কয়লা তোলা নিয়ে অর্থমন্ত্রী ১৬ আগস্ট ঢাকায় অ্যামচ্যামের সভায় বক্তব্য দিলেন। তারই প্রতিধ্বনি শোনা গেল ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: এ রকম অঙ্গীকার ভঙ্গ বিস্ময়কর। ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দেশের কোথাও কয়লা তোলা হবে না; এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে– এ রকম মোট ছয় দফা দাবি মেনে নিয়েছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী জনগণের সঙ্গে এসব দাবি মেনে চুক্তি করা হয়েছিল একটা গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। সেই গণঅভ্যুত্থানে তিনজন শহীদ হয়েছিলেন। এরপর ওই সরকারের আমলে বুয়েটের অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে গঠিত পাটোয়ারি কমিটি জনবসতি ও বিপুল উর্বর জমি হারানোর পাশাপাশি পানিসম্পদসহ পরিবেশ-প্রকৃতির ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার ব্যাপারে নেতিবাচক মত দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলেও মোশাররফ কমিটি নামে একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়। সেটিও উন্মুক্ত পদ্ধতির ভয়াবহতা এবং অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। এগুলো সব দিক থেকে মীমাংসিত বিষয়। এরপরও এ আলোচনা তোলা হয় কীভাবে?
আনু মুহাম্মদ: সম্ভবত এশিয়া এনার্জির, ২০০৬ সালে বিতাড়িত হওয়ার পর যেটার নাম হয়েছে জিসিএম, ফাটকা ব্যবসার টানে এ রকম অতি উৎসাহ। এশিয়া এনার্জির লাইসেন্স নবায়ন হয়নি ২০০৬ সালের পর। তারপরও কোম্পানিটি লন্ডনে মেইনস্ট্রিম শেয়ার মার্কেটের বাইরে অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে এখনও তৎপর। ‘অল্টারনেটিভ মার্কেট’ তাদেরই জন্য, যাদের প্রকল্পে সমস্যা আছে। ক্ষমতাসীন মহল ওই কয়লা তোলা হবে ধরনের কিছু কথা বললে তাদের ফাটকা তৎপরতায় সুবিধা হয়। যেমন আওয়ামী লীগ আমলে মাঝেমধ্যে ইংরেজি এক অখ্যাত পত্রিকায় খবর ছাপিয়ে দেওয়া হতো– সরকার ফুলবাড়ীর কয়লা তোলার ব্যাপারে চিন্তা করছে। ২০১২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ফুলবাড়ীতে হঠাৎ ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ দিয়ে ‘জিসিএম’ কোম্পানিকে ঢোকানোর চেষ্টা করেন। তখনও কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রতিরোধে কোম্পানির ঢোকার চক্রান্ত ভেস্তে যায়। শেখ হাসিনা সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু একবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘এশিয়া এনার্জি বা জিসিএমের কোনো লাইসেন্স নেই’। তাহলে কীভাবে তারা খনি দেখিয়ে শেয়ার ব্যবসা করছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন, ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু ব্যবস্থা নেননি। উল্টো কিছুদিন পর ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে চীনা কোম্পানির সঙ্গে জিসিএমের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তখনও লন্ডনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয়, ওই ফাটকা শেয়ার ব্যবসা থেকে যা আয় হয় তারই একটা অংশ এদেশে আলোচনা তোলার পেছনেও খরচ হয়।
আনু মুহাম্মদ: না জানার কোনো কারণ নেই। একটা লাইসেন্সবিহীন কোম্পানি বাংলাদেশের খনি দেখিয়ে লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করলেও সরকার এখনও কিছু বলছে না। উল্টো ক্ষমতায় আসার মাত্র কদিনের মধ্যে রক্তে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তি, একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটির মত উপেক্ষা করে তাদের কেন বলতে হয় যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই?
সমকাল: এত আন্দোলন ও রক্তপাতের পরও কেন এশিয়া এনার্জিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা থামছে না?