ইতিহাসের তলানি থেকে নিপীড়িত জনগণের লড়াইকে বাংলাদেশের নাটকে যতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেসবের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ অবশ্যই বিশেষভাবে মনে করার মতো রচনা, একটি অন্যতর নান্দনিক, কাব্যময় ভাষ্য। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা ও আধুনিক কাব্যিক উপাদানের একটি শিল্পসিদ্ধ যুগ্মরূপ এই নাটকে পাওয়া যায়। বাংলা নাটক এমনিতেই কাব্য-আশ্রিত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে নাটকের সাহিত্যিক রূপটির প্রসঙ্গে তাকে কাব্য বলেই অভিহিত করেছেন। প্রাচীন বা মধ্যযুগের সকল পালা, লীলা, নাট্য সকলই কাব্যের আধারে রচিত। ঔপনিবেশিকতার নিগড়ে শিল্পায়নের প্রভাবে বাংলা ভাষায় যে গদ্যের ভাষারীতি তৈরি হলো, তারও অন্তরে কাব্যের সুরটি রয়েই গিয়েছিল। নিখাদ গদ্য বলতে আদতে বাংলায় কিছু আছে কিনা ভাবার বিষয় বটে। সৈয়দ শামসুল হকের সমসাময়িক সেলিম আল দীনের নাট্যরচনাতে গদ্য আর কাব্যের ভেদটি একেবারেই লুপ্ত হয়ে যায়, তবে তা– কাব্যনাট্য বলতে যে ফর্ম বোঝায়– তার আধারে নয়, ভাষা ও বিষয়ের অদ্বৈত মর্মে, কাব্য তার অন্তঃসলিলা, বহিরাবরণ নয়। ‘বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম’। অর্থাৎ রসাত্মক বাক্যই কাব্য। এই কাব্যের আধারে যখন নাটক বা কাহিনিকে ধরা হয় তখন তা কাব্যনাট্য হয়ে ওঠে। বুদ্ধদেব বসুর মিথিক্যাল কাহিনির নবরূপায়ণে লেখা ‘প্রথম পার্থ’সহ বিভিন্ন কাব্যনাট্যের পরবর্তীকালে সৈয়দ শামসুল হকের রচনাকেই আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারি। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের মধ্য দিয়ে বাংলা নাট্যভাষায় কাব্যনাটককে তিনি অন্যতর ব্যঞ্জনাপূর্ণ করে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা সেই নাটকে আঞ্চলিক ভাষার আধুনিক সাহিত্যায়ন ঘটেছিল। তার পরপরই ‘পরানের গহীন ভেতর’ কাব্যগ্রন্থে আঞ্চলিক ভাষার কাব্যায়ন ঘটেছে ব্যক্তির প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদ-অভিমানের অম্লমধুর ব্যঞ্জনায়। তার পরই তিনি লেখেন ‘নূরলদীনের সারাজীবন’। কাব্যের উপমা, অলংকার, চলন, ছন্দ, চিত্রকল্প ইত্যাদি এ নাটকের ভাষায় এতটাই শক্তিশালী রূপ নেয়, ভাষাই যেন ঘটনা হয়ে ওঠে, ভাষা কেবল ভাব বা গল্পের বাহন নয়, ভাষাই শাসন করতে চায় যেন কাহিনি বা কহতব্যকে। ইতিহাস, ব্যক্তিক বোধ, সৌন্দর্য, পীড়ন, রক্তপাত সবকিছু ভাষার নানান উপাচারে যেন এক মহান শিল্পযজ্ঞের অগ্নিশিখা জ্বেলে দেয়। ‘এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে ইতিহাসে প্রতিটি পৃষ্ঠায়’ কিংবা ‘যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে’– এমনই অসামান্য বাকপ্রতিমায়। আবার কবিতার চলনে সোজাসুজি লড়াই বা বিপ্লবের সত্য উপলব্ধিও তিনি তুলে ধরেন, চরিত্রের মধ্য দিয়ে বলেন, ‘হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই’।

একটি দার্শনিক প্রত্যয় লোকমানসের সহজ অনুভবে ও যাপনে অবলীলায় সামান্য সত্যের রূপ পেয়ে যায়। আধুনিক কালের কাব্যনাট্যে পশ্চিমা দুনিয়া যাকে অগ্রগণ্য করে রাখে, সেই ইলিয়ট কাব্যনাট্য প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘The Poetic drama must have an emotional unity, let the emotion be whatever you like, It must have a dominant tone, and if this be strong enough, the most heterogeneous emotions may be made to re-enforce it.’ – T. S. Eliot নূরলদীনের সারাজীবন পড়লে মনে হয় সৈয়দ হক যেন ইলিয়টের এই কাব্যনাট্যবিষয়ক ভাবনাকেই মূর্ত করে তোলার মিশনে নেমেছিলেন। সৈয়দ হক নিজেও ছিলেন ইলিয়টের ভাব-অনুরাগী। বিশেষ করে ‘পোড়া জমি’সহ ইলিয়টের একাধিক কাব্যনাট্য আধুনিক কাব্যনাট্যের ভাষা তৈরিতে সৈয়দ হককে সহায়তা করেছে। ‘ঈর্ষা’ নাটকের ভাষার চলনে, ছন্দের গড়নে, বাক্যের ধরনে পাশ্চাত্যের কাব্যনাট্যের বীজ লুকিয়ে থাকলেও ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ আর ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে তিনি বাংলা ছন্দের গীতলতা, চঞ্চলতাকে নাট্যভাষার রুধির স্রোতে প্রবহমান রেখেছেন। যেটা পাশ্চাত্যে নির্মিত ভাষাভঙ্গিমা থেকে ভিন্ন। কাব্য এখানে কোনোরূপ ডিটাচমেন্টকে প্রশ্রয় দেয় না। এখানে কথকের কর্তাসত্তা ঘটনার ওপরও প্রায় সময়ই চেপে বসে, ভাব-ভাবনার দিকদিশা বাতলে দেয়। আমি আর আমরা এবং সে আর তাহারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট কালের নির্দিষ্ট জনপদের বিদ্রোহ বা লড়াইকে তিনি ভাষার অলংকারে কাব্যের মহিমায় ভাবনার নান্দনিক উচ্চতায় এক নির্বিশেষ বা সর্বজনীন আন্দোলন বা জাগরণের বার্তাবহ করে তোলেন। নাটকটি পড়তে পড়তে চরিত্র বা ঘটনার অথেনটিসিটি কিংবা ঘটনা-পরম্পরার চেয়ে উপমা অলংকারে কথার প্রতিমায় মুহুর্মুহু তৈরি হওয়া চিত্রকল্প বা চিত্তকল্পের ঘোরে নতুনভাবে মনের ভেতর তৈরি হতে থাকে সীমার থেকে অসীমের দিকে যাত্রা করা এক হৃৎপরিব্রাজকের বিস্ময়কর যাত্রানামা। বাস্তব ও কল্পনা এখানে কাব্য আর ভাষার শক্তিতে হাত ধরাধরি পথ হাঁটে। কিন্তু সৈয়দ হক পুরোদস্তুর কবি বলে, সেই জটিল নাট্যযজ্ঞকে তিনি উপভোগে বা অধিগ্রহণে সহজ, আনন্দময় ও বিষাদমধুর করে তোলেন। এমনই দ্রোহ-ভাব-ব্যঞ্জনার ঝড় তোলা কাব্যময় নাট্যভাষার একটি নমুনা পেশ করি : নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায় ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায় আসুন, আসুন তবে, আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে; যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে, তখন কে থাকে ঘুমে? কে থাকে ভেতরে? কে একা নিঃসঙ্গ বসে অশ্রুপাত করে? সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপুত্রে মেশে। নূরলদীনের কথা যেন সারা দেশে পাহাড়ী ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়, অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায় যে, আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়, আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায় দিবে ডাক, ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?’ অষ্টাদশ শতকের আশির দশকে রংপুর আর কোচবিহার অঞ্চলে ব্রিটিশ ও স্থানীয় জমিদারদের যৌথ নিষ্ঠুরতায়, শোষণ প্রক্রিয়ায় সর্বহারা হয়ে পড়ে কৃষকপ্রজারা। নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। সেই নিপীড়ক শাসকবর্গের বিরুদ্ধে কৃষকদের এক ব্যাপক সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল। সেই লড়াইয়ের প্রধান নেতা এই নূরলদীন। নাট্যকার সৈয়দ হক নূরলদীন, দয়াশীল, দেবী সিংহ, গুডল্যান্ড প্রমুখকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে তার নাটকে হাজির করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের অনুপুঙ্খ ঘটনা-চরিত্রের সমাবেশ না ঘটিয়ে, এমনকি সংঘটিত লড়াই বা যুদ্ধকে উহ্য রেখে, নিপীড়িত জনতার অন্তর্গত দ্রোহ, লড়াইমুখী তৎপরতা, ক্রমসঞ্চরণশীল প্রতিরোধস্পৃহা সবকিছুকে নূরলদীন ও অপরাপর বিপ্লবীর বরাতে পুরো নাটকে জাগিয়ে রাখার প্রয়াস নিয়েছেন সৈয়দ হক। নূরলদীন আদতে মারা যান কিনা তাও নিশ্চিত নয়, কিন্তু এ নাট্যের রচয়িতা নূরলদীনের মৃত্যু এবং নব-উদ্বোধনকে তার উচ্চারিত আদিগন্ত প্লাবিত বাক্যকল্লোলে মুখর করে তোলেন, যেন-বা চির-অন্ত্যজের মর্ম থেকে উৎসারিত সেইসব কথার ফোয়ারা এই সত্যকে বহমান রাখে– এই বঙ্গে নূরলদীনরা কালে কালে আসে। তাদের মৃত্যু হয় বা অন্তরীণ হতে হয়, কিন্তু কাল কালান্তরে তাদের আবির্ভাব থেমে থাকে না। নূরলদীনের ‘সারাজীবন’ই নূরলদীন নামের এক বিপ্লবীর স্পর্ধা ও চিৎকারের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা বাংলার ‘সারা-ইতিহাস’। দ্রোহী বা বিপ্লবী মানুষের জীবন এক অর্থে জনপদের বা গণমানুষের সামগ্রিক বাঁচার ইতিহাসই, নাটকের নামের মধ্যেও সৈয়দ শামসুল হক সেই রূপককে ধরেছেন। কার্ল মার্কস বলেছিলেন, It is not the consciousness of men that determines their being, but, on the contrary, their social being that determines their consciousness. অর্থাৎ মানুষের চেতনা তার অস্তিত্বকে সূচিত করে না, বরং তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কালের কোনো এক রেখায় সদর্পে দাঁড়িয়ে পড়া দ্রোহী নূরলদীনও তেমনই ব্যক্তি হয়ে নয়, নিপীড়িতের কাল পরম্পরায় সকল যৌথ দগ্ধমানসে সঞ্জীবিত এক সত্তা হয়ে ওঠেন, এক শিল্পস্রষ্টার সৃজনমাধুরীতে তাকে আমরা আমাদের এই কালেও এসে অনুভব করি দমিত অন্তরের জাগরূক মহা-আকাঙ্ক্ষায়।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]