প্রথমেই বলে নেওয়া সমীচীন হবে নিজেকে ভাষাবিদ বলে দাবি করাটা শিষ্টাচারের ভেতরে পড়ে না– এবং আমি সে ব্যাপারে সচেতন হয়েই ব্যাখ্যা দিতে চাই– আমি প্রকৃত বিচারে ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র মাত্র। আসলে সম্প্রতি দেশে অপ ও অশ্লীল ভাষার ব্যবহার নিয়ে যে দ্বিধাবিভক্তি দেখতে পাচ্ছি সে বিষয়ে ভাষাবিদরা কী বলেন, তার একটি আলোচনার প্রারম্ভিক সূত্রপাতের ইচ্ছা থেকে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। ভাষাবিজ্ঞানে অপভাষা বা ‘স্ল্যাং’ পৃথিবীর সকল ভাষার একটি বৈধ রূপ। মূলত অপভাষার পরিসর প্রমিত ভাষার চাইতে বিস্তৃত, যার ভেতর স্থান করে আছে আঞ্চলিক ভাষা এবং প্রমিত ভাষার অনেক অপভ্রংশ। মনে পড়ে বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৬৫ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদনাতে পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রথম প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পর এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান করা হয়। আমার এও মনে পড়ে, এই অভিধানের বেশ বড় পরিসরে পশ্চিমবঙ্গেও চাহিদা ছিল। এ কথা উল্লেখ করে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে ভাষাবিদরা আসলে আঞ্চলিক ভাষাকে বিশেষ গবেষণার বিষয় হিসেবে গণ্য করেন। অবশ্য এ কথাও মনে রাখতে হবে, প্রমিত ভাষাও মূলত এক ধরনের উপ বা আঞ্চলিক ভাষারূপ– অন্য অর্থে একটি স্বতন্ত্র ভাষারূপ। কিন্তু বুঝতে হবে স্ল্যাং বা অপভাষা এবং অশ্লীল ভাষা এক জিনিস নয়; যদিও অনেক অশ্লীল শব্দের মূল উৎস আঞ্চলিক ভাষা। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে এই অশ্লীল শব্দগুলোর কোনো প্রমিত রূপ নেই। এমন অনেক উদাহরণ হাতের কাছেই রয়েছে, এবং বর্তমান লেখাতে তেমন উদাহরণ ব্যবহার থেকে আমি বিরত থাকা সমীচীন মনে করছি। এর প্রধান কারণ, একজন ভাষাতত্ত্বের সজ্ঞান ছাত্রের এই উপলব্ধি থাকা বাঞ্ছনীয় যে ‘স্ল্যাং’ বা অপভাষা এবং অশ্লীল, অপমানজনক বা অবমাননাকর ভাষার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে তাদের ব্যবহারের প্রসঙ্গ, প্রেক্ষাপট বা পরিপ্রেক্ষিত বিচারে। স্ল্যাংয়ের কোনো অভিব্যক্তি নিছক অনানুষ্ঠানিক হতে পারে, কিন্তু অশ্লীল বা অপমানজনক কোনো অভিব্যক্তির উদ্দেশ্য হতে পারে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করা, ভয় দেখানো, অপমান করা, মানসিকভাবে আঘাত করা, ভীতসন্ত্রস্ত করা অথবা মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা। ফলে অশ্লীল ভাষা ব্যবহারকালে ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিচারগুলো হলো: কে বলছে, কাকে বলছে, কোন প্রেক্ষাপটে বলছে, কী উদ্দেশ্যে বলছে এবং সর্বোপরি এই ভাষার ব্যবহারে এর সামাজিক প্রভাব কী? যেমন আমি বলতে পারি আমি কেন এই লেখাতে প্রমিত এবং অপভাষা থেকে ব্যুৎপত্তিপ্রাপ্ত অশ্লীল ভাষার উদাহরণ ব্যবহার করব না– কারণ এটি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিতব্য প্রবন্ধ এবং। প্রেক্ষাপট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। ভাষাতত্ত্ব বলছে একজন ভাষাবিদের এই ধারণার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা উচিত যে, প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত কোনো শব্দের একটি স্থির নৈতিক মূল্য রয়েছে। আরও একটি বিশেষ বিষয় বিবেচনাতে আনা আবশ্যক, যেটি হলো, বিশ্বের সব ভাষাতে অশ্লীল শব্দভান্ডার রয়েছে– ভাষার সাথে অশ্লীল শব্দের অস্তিত্বকে অস্বীকার ভাষাবিদরা করেন না। অশ্লীল শব্দের অভিধান আমরা জানি, অনেক ভাষাতেই আছে, এমনকি বাংলা ভাষাতেও রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে যে কোনো পরিপ্রেক্ষিতে, ঐ ভাষা ব্যবহারকারীদের ঐ শব্দগুলো ব্যবহারের অনুমতি সনদ দেওয়া হয়েছে। এমন শব্দাবলি ব্যবহারের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগগত বা প্র্যাগম্যাটিক অর্থ থাকে। যেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের পারস্পরিক কথোপকথন (যাকে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান একসময় বলেছিলেন লকার-রুম টক), স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গতা, রাজনৈতিক বক্তৃতা, শ্রেণিকক্ষ (যেমন ভাষাবিজ্ঞানের শ্রেণিকক্ষে প্রমিত, অপ এবং অশ্লীল ভাষার প্রসঙ্গ এবং উদাহরণ) অথবা কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি আক্রমণ করা। প্রয়োগতত্ত্বের গুরুত্ব এখানেই। একটি শব্দের অর্থ শুধু অভিধানে দেওয়া সংজ্ঞার ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকে না– বরং প্রেক্ষাপট, বক্তার উদ্দেশ্য, বক্তা ও শ্রোতার পারস্পরিক সম্পর্ক, পরিস্থিতি এবং সর্বোপরি সামাজিক রীতিনীতির ওপর নির্ভরশীল। যেমন– বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান প্রায়শ একটি চার অক্ষরের অশ্লীল শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত, এমন শব্দ, এমনকি ইংরেজিতেও (কারণ আমরা অশ্লীলতার বর্ম হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে থাকি) আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান ব্যবহার করলে আমরা স্তম্ভিত হবো নিশ্চয়ই। তবে একটি বিশেষ সতর্কবাণী উচ্চারণ না করলেই নয়। ভাষাবিদরা বলেন জনপরিসরে ভাষা ব্যবহারে অধিকতর সাবধানতার দাবি রাখে। অবশ্য এ কথাও ঠিক, একজন ভাষাবিদকে বাধ্যতামূলকভাবে সেন্সরশিপের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে– এমন কখনোই নয়। তবে তাঁকে স্বীকার করতে হবে যে জনপরিসরে বা জনসমক্ষে ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে অধিকতর সামাজিক দায়িত্ব সম্পৃক্ত। যে ভাষা ব্যবহৃত হয় সংসদে, শ্রেণিকক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদমাধ্যমে, জনসভাতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে সাধারণ এবং চিহ্নিতভাবে জনপরিচিত ব্যক্তিদের সামাজিক মাধ্যমে তা সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করতে এবং সামাজিক মানদণ্ডকে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হয়, এবং ফলে সেখানে সতর্কতা গ্রহণ করা আবশ্যক। সুতরাং একজন ভাষাবিদ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে উপযুক্ততার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন। কারণ ভাষাগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক দায়িত্ব পাশাপাশি থাকতে হবে। যুক্তিটি হলো: একজন পরিণত ভাষাবিদ যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকবে তেমনি একই সঙ্গে বাস্তবকে অস্বীকার করবে না যে স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে তার পরিণতির প্রতি উদাসীন হয়ে থাকবে। তার অর্থ এই যে “এই শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এটি একটি গালিগালাজ বা সামাজিকভাবে বর্জনীয় শব্দ” এবং “এই শব্দটি নির্দিষ্ট জনপরিসরে এই শব্দাবলি ব্যবহারে সামাজিক, প্রয়োগতাত্ত্বিক ও নৈতিক পরিণতি সম্পর্কে মানুষের সচেতন থাকা উচিত” এই দুই বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের বিষয়ে সচেতন হওয়া বাঞ্ছনীয়। অবশ্য ভাষাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রূপে আমি দ্বিতীয় অবস্থানটিকে যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য মনে করি। আমি আগেই বলেছি গালিগালাজ বা অশ্লীল শব্দ ভাষারই অন্তর্গত রূপ, যা অপরিহার্যভাবে বিশ্বের সকল ভাষাতেই বর্তমান। কারণ গালি, কটূক্তি, অশ্লীলতা বা abusive language-কে খারাপ ভাষা ভেবে বর্জন করলে তার একটি সামাজিক ও ভাষাতাত্ত্বিক তাৎপর্য উপেক্ষা করা হবে। ভাষাবিদের কাজ নৈতিক পুলিশ হিসেবে আচরণ করা নয়, আবার ভাষাগত অবাধ্যতা বা অনুমোদনযোগ্যতার একজন নির্বিচার প্রবক্তা হওয়াও নয়। কারণ জনপরিসরের বক্তব্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাথে ভাষার ক্ষমতা এবং তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতাও থাকা উচিত। একটি মজার ব্যাপার উল্লেখ না করে পারছি না। অশ্লীল শব্দ, গালাগালি এবং অপমানজনক ভাষার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, নারীর যৌনতা অধিকাংশ সংস্কৃতির অপমানের একটি শক্তিশালী উৎস। এখানেই পিতৃতান্ত্রিক ভাষার এক গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়। গালির লক্ষ্য পুরুষ হলেও তার ভাষিক বিষয়বস্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এবং অধিকাংশ ভাষাতেই নারী। বলা যায়: Gendered abuse may be gender-neutral in target but deeply gendered in content, অর্থাৎ লক্ষ্যভাষায় লিঙ্গ-নিরপেক্ষ হলেও লিঙ্গভিত্তিক গালিগালাজের অন্তর্নিহিত বিষয় এবং অর্থ লিঙ্গ-নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। গালিগালাজ বা অশ্লীল ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পিতৃতান্ত্রিক এবং নারী অপমানকর, এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিকভাবে এমন শব্দ উচ্চারণ থেকে বিরত থাকাটা যেমন শ্রেয়, তেমনি আশা করা উচিত একটি সমাজের নারী সম্প্রদায় এমন ভাষা ব্যবহারের বিরুদ্ধে সবচাইতে প্রতিবাদী হবে এমনটাই প্রত্যাশিত।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]