বুধবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্বাচিত কাউন্সিলরশূন্যতায় মশক নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনা সুস্পষ্ট। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটিতেছে। মশক নিয়ন্ত্রণের ন্যায় জরুরি জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে যে ভাটা পড়িয়াছে, উহাও সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশিত। বিশেষত প্রতিটি ওয়ার্ডে মশককর্মী যেই সংখ্যায় থাকিবার কথা, উহার অর্ধেক সংখ্যক কার্যরত। তাও তদারকির অভাবে এই অভিযানে অনিয়ম লক্ষণীয়। এহেন পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতাকর্মীগণ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত হইতেছেন। এমন উদ্যোগ সাময়িকভাবে মানুষের দুর্ভোগ হ্রাসে সহায়ক হইতে পারে। প্রশ্ন হইল– নাগরিক সেবা কি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের উপর নির্ভরশীল। তৎকারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টি রাজধানীসহ সর্বত্রই জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

আমরা দেখিয়াছি, মশাবাহিত রোগ, বিশেষত ডেঙ্গু নগরবাসীর জন্য প্রতি বৎসর বৃহৎ মাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈয়ার করিয়াছে। বৃহস্পতিবারের খবর অনুযায়ী, পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও আটজনের মৃত্যু হইয়াছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছে দেড় সহস্রাধিক রোগী। রাজধানী ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে থাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, জমিয়া থাকা পানি অপসারণ এবং নিয়মিত ঔষধ ছিটাইবার ন্যায় কার্যক্রম নিয়মিত হওয়া জরুরি। এই সকল প্রাথমিক কার্যক্রমে সামান্য শৈথিল্যও পরিস্থিতিকে জটিল করিয়া তুলিতে পারে। আমরা মনে করি, মশক নিয়ন্ত্রণকে কোনোভাবেই মৌসুমি বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিরূপে দেখিবার অবকাশ নাই এবং ইহাতে জনবল ঘাটতি থাকার অর্থই হইল নগরবাসীকে বিপদে ফেলা।

আমরা জানি, ঢাকার কাউন্সিলরগণ সাধারণত ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ, স্থানীয়দের সহিত যোগাযোগ স্থাপন এবং সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহিত সমন্বয় সাধনের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাহাদের অনুপস্থিতিতে উক্ত সমন্বয়সহ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঘাটতি দেখা যাইতেছে। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় ১৬৮ কাউন্সিলরের স্থলে ২০ জন আঞ্চলিক নির্বাহী কার্যক্রম চালাইতেছেন। এমতাবস্থায় মশক নিধনসহ জরুরি কর্মসূচি কতটা ব্যাহত হইতেছে, বলিবার অপেক্ষা রাখে না। তবে পরিস্থিতির কারণে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীগণ মাঠে নামিয়া কার্যক্রমে ব্যাপৃত হইলেও ঘাটতি পূরণ হইবার নহে। রুটিন অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে গিয়া অভিযান চালাইবার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পক্ষে অসম্ভব। প্রশাসন তাহাদের উপর ভরসা করিলে গুরুত্বপূর্ণ এই কার্যে সমন্বয়হীনতা অবশ্যম্ভাবী এবং মানুষ যথাযথ সেবা হইতে বঞ্চিত হইবার সমূহ আশঙ্কা রহিয়াছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির কারণে নিয়মিত মশক নিধন অভিযান জরুরি হইয়া পড়িয়াছে এবং উল্লিখিত দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগকেই যথাযথভাবে পালন করিতে হইবে। ওয়ার্ডভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত লার্ভা নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ঔষধ ছিটাইবার তথ্য প্রকাশ এবং নাগরিক অভিযোগ গ্রহণে কার্যকর ব্যবস্থাও থাকিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মীদের উপর নির্ভরশীল হওয়া যাইবে না। তজ্জন্য সিটি করপোরেশনের কোথায় কতজন কর্মী কার্যরত, কী পরিমাণ ঔষধ ব্যবহার করা হইতেছে এবং কোন এলাকায় কতবার অভিযান পরিচালিত হইতেছে, এই সকল হিসাব লইয়া নিয়মিত মূল্যায়ন করিতে হইবে।

রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলি চাহিলে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করিয়া সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রজননস্থল ধ্বংসে সহযোগিতা করিতে পারে। তবে এই সহযোগিতা যেন দলীয় প্রচার, প্রভাব বিস্তার কিংবা নাগরিক সেবাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সহিত যুক্ত করা না হয়, সেইদিকে সতর্ক থাকিতে হইবে। স্মরণে রাখিতে হইবে, নাগরিক সেবা কোনো দলের অনুগ্রহ নহে, বরং নগরবাসীর অধিকার। এখন সরকারের দায়িত্ব জনবল সংকট দূর করিয়া যথাসম্ভব রুটিন অনুযায়ী ঢাকার উভয় সিটিতে মশক নিধনকর্ম অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনসহ সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুতই সম্পন্ন করিতে হইবে। এইভাবে নগরবাসীকে বিপদে রাখা চলিবে না।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]