দশকের পর দশক ধরে জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বরং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বৈশ্বিক যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাই দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও পরিবেশসম্মত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা সবচেয়ে উজ্জ্বল। কিন্তু খাদ্য উৎপাদনের জন্য যেখানে কৃষিজমিরই সংকট, সেখানে সৌরবিদ্যুতের জন্য আলাদা জমি ব্যবহার বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে এগ্রিভোল্টাইক– একই জমিতে একসঙ্গে কৃষি ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা।

একই জমিতে খাদ্য ও বিদ্যুৎ এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থায় কৃষিজমির ওপর বা পাশে এমনভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়, যাতে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ ব্যবস্থার বিদ্যুৎ সেচপাম্প, কৃষিপণ্য শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ মিল, বৈদ্যুতিক যান চার্জিং, গৃহস্থালি ও অন্যান্য গ্রামীণ কাজে ব্যবহার করা যায়। দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট-মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে কৃষক বা সমবায়ের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে ব্যক্তিগত কৃষকের পক্ষে এ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল। তাই সমবায় বা উৎপাদক সংগঠনের মাধ্যমে তা অধিক কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা ২০২৩-২৪ সালে বাংলাদেশ ইকোলজি ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) নেটওয়ার্কের সদস্য হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মাটি বাংলাদেশ এগ্রিভোল্টাইক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের গোড়ায় শেরপুরের নকলা উপজেলার মাটি ইকো-ভিলেজে মোট ৩৫.৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ৮.৮ কিলোওয়াটের একটি সেচ এবং ২৬.৫ কিলোওয়াটের অন্যটি নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ দিবাযত্ন কেন্দ্র, ইকো-প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডিজিটাল ক্লাসরুম, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, অফিস ও আবাসনের বিদ্যুৎ চাহিদাও পূরণ করছে। দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাতে ব্যবহারের জন্য ৫.১ কিলোওয়াট-ঘণ্টা ক্ষমতার ব্যাটারি রয়েছে। ফলে ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে সমন্বিত করে বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি বাস্তব মডেল তৈরি হয়েছে।

গবেষণায় যে সম্ভাবনা দেখা গেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশলী অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহার তত্ত্বাবধানে তিনজন মাস্টার্স শিক্ষার্থী ৩৫.৩ কিলোওয়াটের এই এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থার কারিগরি কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেছেন। এতে সৌরশক্তির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্যানেলের ছায়ায় ফসলের ফলন এবং সম্মিলিত ভূমি ব্যবহারের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। ২০২৫ সালে ব্যবস্থাটি মোট ৩৯,২৩৩.১৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ২১,১৪৬.৮০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। ফসলের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রজাতি ও মৌসুমভেদে ভিন্ন। এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থায় হলুদের ফলন ছিল প্রতি বর্গমিটারে ২ কেজি, যেখানে খোলা মাঠে হয় ১.২৫ কেজি। ২০২৫ সালের গ্রীষ্ম ও শীত মৌসুমে বেগুনের ফলনও খোলা মাঠের তুলনায় বেশি ছিল। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে গিমা কলমি ও টমেটোর ফলন খোলা মাঠের সমান এবং শসার ফলন ছিল প্রায় ৯০.৯১ শতাংশ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিস্টেম দুটির নেট-মিটারিং সংযোগ সম্পন্ন হয় এবং মার্চ থেকে অন-গ্রিড কার্যক্রম শুরু হয়। মাটি বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, এরপর থেকে সিস্টেমটি প্রায় ৭.৮৮ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে এসব ফলাফল বাংলাদেশের সব ফসল, মাটি ও জলবায়ুর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। সর্বোত্তম প্যানেল বিন্যাস, উচ্চতা ও ছায়ার মাত্রা নির্ধারণে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা প্রয়োজন।

সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ এগ্রিভোল্টাইক সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা হলো প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, কাঠামো ও স্থাপন ব্যয় সাধারণ কৃষকের জন্য বড় বোঝা। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক এবং করও বিনিয়োগ ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্দিষ্ট সরঞ্জামে বিশেষ শুল্ক-সুবিধা এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করেছে। আরেকটি সমস্যা হলো সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে কৃষকদের কারিগরি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।

নেট-মিটারিং: বড় বাধা মাটি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় ৩৫.৩ কিলোওয়াটের এগ্রিভোল্টাইক প্রকল্পের নেট-মিটারিং সংযোগ পেতে প্রায় ১০ মাস সময় লেগেছে। ফলে এ সময়ে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সংযোগ পাওয়ার পরও অতিরিক্ত বিদ্যুতের আর্থিক সমন্বয় ও বিলিং ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় বেশি উৎপাদিত হলেও চাহিদা বেশি থাকে সন্ধ্যা ও রাতে। তাই দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে রাতে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যাটারির ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।