কখনও কখনও মনে হয়, আমরা শুধু একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, বরং একটি কঠিন সামাজিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললে ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও নানা ধরনের নির্যাতনের খবর চোখে পড়ে। নদী দখল, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বায়ুদূষণের খবরও আমাদের প্রায় প্রতিদিন দেখতে হয়। সামাজিক মাধ্যমে আসে ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও শোক। কয়েক দিন পর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনোটিকে আড়াল করে দেয়। কষ্টের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আমাদের স্মৃতি থেকে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে ধর্ষণের অভিযোগে সাত হাজার ৬৮টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৯টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালে এমন মামলা ছিল পাঁচ হাজার ৫৬৬টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্র ৬৪১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৪০০ জন নারী এবং ২৪১ জন শিশু। একই সময়ে ধর্ষণের পর ৩৭ জন নারী নিহত এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৫২টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

ছিনতাই ও ডাকাতির চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে এক হাজার ৯৩৫টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। ডাকাতির মামলা হয়েছে ৭০২টি, বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। একই বছরে চুরির মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৬৭২টি এবং অপহরণের মামলা এক হাজার ১০১টি। একজন মানুষ অফিস শেষে বাড়ি ফিরছেন। একজন শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর বাসায় যাচ্ছেন। একজন ব্যবসায়ী দিনের উপার্জন নিয়ে ঘরে ফিরছেন। তাদের মনে যদি প্রশ্ন থাকে– রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন না, তাহলে সেই সমাজকে নিরাপদ সমাজ বলা খুবই কঠিন।

সংবিধান আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। অথচ বাস্তব জীবনে যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতা, অন্যায় ও বৈষম্যের মুখোমুখি হয়, তখন রাষ্ট্র তার দায়িত্ব এড়িয়ে চলে কিংবা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র চাপা দিতে চায়। এসব সমস্যার সমাধান কী? কেমন করে এই অবক্ষয় থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি? আমরা জানি, অপরাধীর মনে আইনের ভয় তৈরি হয় তখন, যখন সে জানে– অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি পেতে হবে। তাই আইনের শাসনকে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, সাক্ষীর নিরাপত্তা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং আদালতের রায় কার্যকর নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু শুধু কঠোর শাস্তি দিলেই অপরাধ বন্ধ হবে না। এ জন্য উপযুক্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বিশেষত মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা প্রাধান্য লাভ করবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের দায়িত্ব নতুন করে ভাবতে হবে। সন্তানকে শুধু ভালো ফল অর্জনের জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না। মানুষের প্রতি সম্মান, নারীর মর্যাদা, আত্মসংযম, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং আইন মেনে চলার শিক্ষা দিতে হবে।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদ যেন শুধু একটি পোস্টে সীমাবদ্ধ না থাকে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অবস্থান, আইন মেনে চলা এবং নিজের আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি। দেশ শুধু একটি মানচিত্রের নাম নয়। দেশ মানে মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আরও বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই? যে বাংলাদেশে একজন নারী নিরাপদে চলতে পারবে; একটি শিশু ভয় ছাড়া বেড়ে উঠবে; একজন নাগরিক নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরবে; অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব নয়, আইনের শাসনই হবে শেষ কথা; মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ভিত্তি হয়ে থাকবে; নদী-পাহাড়-বন ও বাতাস মানুষের লোভের কাছে পরাজিত হবে না। সেই বাংলাদেশ তৈরি করার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়; আমাদের সবার। আজ আমরা যদি প্রশ্ন না করি; প্রতিবাদ না করি; নিজেদের আচরণ না বদলাই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা না ভাবি, তাহলে একদিন তারাই আমাদের কাছে প্রশ্ন করবে, যখন সবকিছু চোখের সামনে ঘটছিল, তখন তোমরা কী করেছিলে? ইতিহাসের পাতায় আমরাও সমানভাবে অপরাধী হয়ে থাকব। শাকিল কবির: পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী

ই-মেইল: [email protected], [email protected]