পুলিশের গাড়ি ছিল। নাম্বারপ্লেটসহ ‘অভিদের’ সেই সাদা গাড়িও ছিল; কিন্তু পুলিশ কোনো সুলুক পাচ্ছে না। বন্ধু আলতাফ পারভেজ ঠিকই লিখেছেন– ‘কিছু অস্পষ্ট নেই, কিছু গোপন নেই আর। মিরপুরের ঘটনায় সংবাদ মাধ্যম দায়িত্ব পালন করেছে। বাকি করণীয় দেশের মানুষের।’ শেষে না কেউ বলে বসে– কেউ ভাঙেনি রাড্ডা; ওটা এমনি এমনি গোল্লায় গেছে। যেমন বলা হয়– ভারতের সিস্টার অভয়াকে বা আমাদের সাগর-রুনিকে কেউ খুন করেনি।

সত্তরের মহাপ্লাবন গোর্কি যখন ভোলা, মনপুরা, হাতিয়ার জনপদ থেকে লাখো মানুষ আর গবাদি প্রাণী ভাসিয়ে নেয়, আমরা তখন পাকিস্তান ভূখণ্ডে। পাকিস্তান সরকারের কোনো খবর ছিল না। সারাদেশ থেকে বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠন তখন ছুটছে চিড়া গুড় মুড়ি চাল আর পুরোনো কাপড় নিয়ে ভোলা মনপুরা হাতিয়া সন্দ্বীপ বরিশালে। চার্চের পাদ্রি নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার টিম সবাই শামিল সেই ত্রাণ মিছিলে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন কোনো এনজিও কাজ করত না। সেই অভূতপূর্ব অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে এ দেশে এসেছিল সেভ দ্য চিলড্রেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংস্থাটি শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে কাজ করে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যান্য সেভ দ্য চিলড্রেন। সেভ দ্য চিলড্রেনকে সুইডিশ ভাষায় বলে রাড্ডা বারনেন। উচ্চারণ মোটামুটি ‘রেদ্দা বার্নেন’।

সেই সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেন ১৯৭৪ সালে মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এটা শুধু সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষকে সেবা দিত না। এর সেবার মান সবাইকে আকৃষ্ট করেছিল। মোট কথা, কেন্দ্রটি ছিল সব শিশুর। মিরপুরের অনেক পরিবার আছে যাদের তিন পুরুষ জীবনের প্রথম টিকা নিয়েছেন এই কেন্দ্র থেকেই। গত ৫০ বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দক্ষতার সাক্ষী অন্য এক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি গত সপ্তাহেই রাড্ডা অফিসে একটা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সভা ও মতবিনিময় করে এলাম। ওদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যতিক্রমী, সাফল্য ঈর্ষণীয়; কর্মীদের উদ্দীপনা ও কর্মস্পৃহা সাড়া জাগানো..!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘দেশের সরকার যেখানে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে না, সেখানে রাড্ডার মতো একটি প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে প্রান্তিক জনগণের বিশেষত মা, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে আসছে।’

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার বর্তমানে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত।

মিরপুরের এই সেন্টারে বৃহস্পতিবার যে হামলা হয়েছে, তাকে তার প্রকৃত নামেই অভিহিত করতে হবে: এটি ছিল নৈতিক অধঃপতনের চরম নিম্নস্তরে নেমে যাওয়া এক জঘন্য কর্মকাণ্ড। ভঙ্গুর আইনি কাঠামো, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধানে বিমুখতা, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও ধ্বংসপ্রায় মানবিক মূল্যবোধ এক শ্রেণির মানুষ বা গোষ্ঠীকে অপরিণামদর্শী, ধ্বংসাত্মক ও অপরাজেয় করে তুলছে।

রাতের আঁধারে দুই শতাধিক ‘মুখোশধারী’ লোক হাতুড়ি, লাঠি ও ভারী খননযন্ত্র নিয়ে সেখানে হামলা চালায়। লুটপাটের সঙ্গে তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। যে কেন্দ্রটি মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল, সেখানেই এমন লুটপাট প্রমাণ করে– এটি শুধু একটি বেআইনি জমি দখলের ঘটনা নয়; এটি ছিল বর্বর ও কাপুরুষোচিত আগ্রাসন, যা আমাদের সবার জন্য গভীর জাতীয় লজ্জার কারণ।