অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসা এবং আমদানি করা এলএনজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপের মুখে ফেলছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এখন আর শুধু পরিবেশ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কৌশল শুধু সৌর প্যানেল স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্মার্ট গ্রিড, জ্বালানি দক্ষতা, সবুজ অর্থায়ন এবং কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাকেও এই রূপান্তরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যকে বাস্তবায়নে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কারিগরি এবং নীতিগতভাবে কতটা প্রস্তুত।
যেসব প্রাকৃতিক উৎস ক্রমাগত পুনর্নবীকরণ হয় কিংবা মানুষের সময়মাত্রায় কার্যত নিঃশেষ হওয়ার আশঙ্কা নেই, সেসব উৎস থেকে উৎপাদিত শক্তিই নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সূর্যের আলো, বাতাস, প্রবাহিত পানি ও জৈববস্তু এর পরিচিত উদাহরণ।
বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সম্ভবত সৌরশক্তিতে। ভৌগোলিক কারণে বড় আকারের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সীমিত। আবার বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনাও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত। বিপরীতে দেশের প্রায় সর্বত্রই সূর্যালোক পাওয়া যায়। এ কারণেই সরকারের কৌশলে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি ও সৌরবিদ্যুতের সমন্বিত ব্যবস্থা– এগ্রিভোল্টাইকস, সৌরশক্তিচালিত হিমাগার এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির সৌর চার্জিং অবকাঠামোর মতো বহুমুখী ব্যবহারের কথা এসেছে।
এর সবচেয়ে বড় কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা। সরকারের কৌশলপত্রেই স্বীকার করা হয়েছে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুতের চাহিদা বছরে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার সরাসরি সম্পর্ক। এলএনজি, তেল কিংবা কয়লা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় কিনতে হয়। পক্ষান্তরে সূর্যের আলো আমদানি করতে হয় না। ফলে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী প্রতিটি অতিরিক্ত ইউনিট দেশীয় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রতি বাংলাদেশের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমাতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রপ্তানি প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমেই কার্বন-সচেতন হচ্ছে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াসহ বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের সহজলভ্যতা ভবিষ্যতে পরিবেশগত মান পরিপালন, বাজারে প্রবেশ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার ব্যয় হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।