মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে ফিচারমেন্ডেলীয় সূত্র থেকে মানব ক্লোনিং—বিজ্ঞান কত দূর এগোললেখা: নয়ন আহমেদপ্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ২০ প্রতীকী ছবিজীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর একটি বংশগতি বা জেনেটিকসের উন্মোচন। কীভাবে একটি আণুবীক্ষণিক কোষের ভেতর লুকিয়ে থাকা রাসায়নিক সংকেত পিতামাতার বৈশিষ্ট্যকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেয়, সেই কৌতূহল থেকেই আধুনিক জেনেটিকসের যাত্রা শুরু।

আধুনিক বংশগতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপিত হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। অস্ট্রিয়ান গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মঠের বাগানে প্রায় ২৯ হাজার মটরশুঁটি উদ্ভিদের ওপর দীর্ঘ সংকরায়ণ পরীক্ষা চালান। উদ্ভিদের কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, ফুলের রং ও বীজের আকৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি বংশগতির মৌলিক সূত্রগুলো আবিষ্কার করেন। কিন্তু জীবদ্দশায় তাঁর এই অসাধারণ আবিষ্কার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। জীবদ্দশায় স্বীকৃতি না পেলেও তাঁর প্রস্তাবিত ‘ফ্যাক্টর’ ধারণাই পরবর্তী সময়ে ‘জিন’ নামে স্বীকৃতি পায়।

বিংশ শতকের মাঝামাঝি জেনেটিকস পায় এক বৈপ্লবিক রূপ। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক ও আমেরিকান বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ডিএনএর দ্বি-সূত্রক বা ‘ডাবল হেলিক্স’ মডেল উন্মোচন করেন। এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিল রসায়নবিদ রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের ধারণকৃত বিখ্যাত এক্স-রে ছবি ‘ফটোগ্রাফ ৫১’। এই কাঠামোর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় কীভাবে চারটি ক্ষারক—অ্যাডেনিন (A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G) ও সাইটোসিন (C) জীবনের সব জৈবিক নির্দেশিকা বহন করে।

বর্তমান সময়ে জেনেটিকস কেবল পর্যবেক্ষণের বিষয় নয়, এটি সরাসরি জীবদেহের নকশা পুনর্লিখনের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৩ সালে সমাপ্ত ‘হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট’ মানুষের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার জিনের সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স উন্মোচন করে চিকিৎসার দিগন্ত বদলে দিয়েছে।

এরপর ২০২০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী গবেষক ইমানুয়েল শার্পেনশিয়ে ও জেনিফার ডৌডনার হাত ধরে আসে ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ (CRISPR-Cas9) জিন এডিটিং প্রযুক্তি। এটি আণবিক কাঁচির মতো নিখুঁতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ডিএনএ কেটে সেখানে নতুন ডিএনএ যুক্ত করতে পারে। বর্তমানে থ্যালাসেমিয়া ও সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতো রক্তজনিত জটিল রোগের পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট ক্যানসারের চিকিৎসায় জিন থেরাপি সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। তবে এর সমান্তরালে ভ্রূণের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে কৃত্রিমভাবে পছন্দসই সন্তান বা ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরির যে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা বিজ্ঞানীদের মধ্যেই আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে জেনেটিকস ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে মানব ইনসুলিন তৈরি করে ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের চিকিৎসাকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করেছে। তা ছাড়া রোগীর ব্যক্তিগত জেনেটিক গঠন বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট টার্গেটেড থেরাপির প্রয়োগের মাধ্যমে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যা ক্যানসারের মতো রোগকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। জন্মপূর্ব জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর ক্রোমোজোমীয় অস্বাভাবিকতা ও জন্মগত ত্রুটি প্রাথমিক অবস্থাতেই নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা যায়। যার ফলে সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।