উপভোগ শব্দটার মাহাত্ম্য বোধহয় শুধু তারাই টের পেয়েছেন, ৪৮ ঘণ্টা আগে যারা মালয়েশিয়া ম্যাচে বাংলাদেশের ছন্নছাড়া ফুটবল দেখে হতাশ হয়েছিলেন। আর নখ কামড়ানো আফসোসের সেই তীব্র অনুভতিটাও ছুঁয়ে গেছে শুধু তাদেরই, যারা আগের দিন লজ্জায় মুখ ঢেকে ফুটবল বিধাতার কাছে স্রেফ একটা ভদ্রস্থ পারফরম্যান্সের প্রার্থনা করছিলেন। গতকাল সোমবার সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে মাঠে নেমে শমিত-জামালরা যে প্রেসিং ফুটবল উপহার দিলেন, তা ছিল সমর্থকদের জন্য চোখের আরাম। রক্ষণাত্মক খোলস থেকে বেরিয়ে, মিস পাসের জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে লড়াকু ফুটবলই খেলেছেন হামজা-শুকিরা। কিন্তু দিন শেষে ফুটবল বড় নিষ্ঠুর, বড় নির্মম।
স্কোরবোর্ডের ওই ১-০ ব্যবধানের হারটাই ট্র্যাজেডি হয়ে থাকল। আক্রমণের মাঝেও একজন জাত স্ট্রাইকারের অভাব যেন এক প্রকট ক্যান্সার হয়ে ধরা দিল। আক্রমণ হলো, শিল্প হলো, কিন্তু গোলটাই পাওয়া হলো না। আর ঠিক এই ফিনিশিংয়ের অভাবেই টানা দুই ম্যাচ হেরে ফিফা আসিয়ান কাপের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্নটা কপূরের মতো উড়ে গেল বাংলাদেশের। আগামী বৃহস্পতিবার গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে অন্তত গোলের জন্য লড়বেন হামজারা। ম্যাচের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বাংলাদেশি সমর্থকদের আফসোস প্রকট হতে বাধ্য-সিঙ্গাপুরের চেয়ে বল পজেশনে ৫২ শতাংশ এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ, কর্নার আদায় করেছে গুনে গুনে ১১টি! পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের আক্রমণের হার ছিল শতকরা ৮৯ ভাগ, যেখানে সিঙ্গাপুর থেমেছে ৮২তে। কিন্তু শট অন টার্গেটে সিঙ্গাপুর যেখানে ৫, সেখানে বাংলাদেশ মাত্র ১।
গোলপোস্টের ওপর দিয়ে যাওয়া শমিত সোমের একটি হেড ছাড়া বলার মতো আর কোনো শটই ছিল না ম্যাচে। অথচ এদিন কোচ থমাস ডুলি তাঁর 'রাতারাতি বদলানো যায় না' তত্ত্বের বাইরে গিয়ে শুরুর একাদশে চারটি বদল নিয়ে মাঠ সাজিয়েছিলেন আক্রমণাত্মক কৌশলে। মাঝামাঠ ও আক্রমণভাগে নতুন গতি আনতে একাদশে জামাল ছাড়াও ফিরিয়েছিলেন জিন্দান ইউসুফ, শুকি ইতোফুসা ও শেখ মোরছালিনকে। আগের ম্যাচের মূল একাদশ থেকে বাদ দিয়েছিলেন শাকিল আহাদ তপু, সোহেল রানা সিনিয়র, ফারহান আলী ওয়াহিদ ও ফাহামিদুল ইসলামকে। পরিবর্তনের ছাপ ম্যাচ শুরুর দুই মিনিটের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়। মাঝমাঠ থেকে শমিতের বাড়ানো পাস রাকিব ক্রস করতে গিয়ে কর্নার করে বসেন। সাদ-তারিক-জায়ানরা এদিন নিচের থেকেই আক্রমণ সাজিয়ে দিচ্ছিলেন মাঝমাঠে। শুরুর বিশ মিনিটে ছোট পাসগুলোতে মাঝমাঠের দখলও ছিল হামজা-শমিতদের হাতেই।
১৯ মিনিটের মাথায় গোলরক্ষক শ্রাবণের বাড়ানো এক হাতের লং পাসে দারুণ একটি কাউন্টার অ্যাটাকের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শুকি থেকে রাকিবের ক্রসে সেই সম্ভাবনাটি শেষ হয়ে যায়। ঠিক এখানেই একজন জেনুইন স্ট্রাইকারের অভাব দারুণভাবে চোখে পড়ে। রাকিব পুরো ৯০ মিনিট খেলেছেন, গতি আছে তাঁর। সেই সঙ্গে ভুলভাল ক্রসপাস আর বল হারানোর পুরোনো রোগটাও আছে। এ সময় অন্তত দুটি গোল দারুণভাবে সেভ করেন শ্রাবণ। একটি নিশ্চিত গোল এক হাত বাড়িয়ে, অন্যটি বারপোস্টের ওপর দিয়ে বল পাঠিয়ে। বাংলাদেশের গতিময় এই ফুটবল কুলিং ব্রেকের পর একটু যেন শ্লথ হয়ে যায়। আর ঠিক তখনই বা প্রান্ত থেকে নুর আদম আব্দুল্লাহর বাড়ানো ক্রসে বক্সে ফাঁকায় হেডে গোল করেন হ্যারিস স্টুয়ার্ট। কোনো ম্যান-মার্ক ছিল না, জোনাল কভারও না। ডিফেন্ডাররা কোনো প্রতিরোধ গড়তে না পারায় গোলরক্ষক শ্রাবণের শুধু বল জালে জড়ানো দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধের লক্ষ্য নিয়ে বেশ কিছু বদল এনেছিলেন কোচ। শমিত হলুদ কার্ড পাওয়ার পর কিছুটা সতর্ক ছিলেন বটে, ক্লান্তও ছিলেন। কিন্তু তিনিই প্রেসিং ফুটবলে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছিলেন। তাঁর জায়গায় সোহেল রানা জুনিয়র এসে কয়েকটি বর্মার দেখা ছাড়া তেমন কিছু করতে পারেননি। মুরছালিনের জায়গায় অভিষেক করান স্বাধীনকে। শুকির জায়গায় ফাহমিদুল আর ডিফেন্সে জায়ানের জায়গায় রহমত মিয়া। কিন্তু রাকিবের জায়গায় ফারহানকে নামানোর ভরসা তিনি পাননি। ফাহমিদুল বাঁ দিক থেকে ডিবক্সের কাছাকাছি কিছু সুযোগ তৈরি করেছিলেন, স্বাধীন দেশের হয়ে প্রথম ম্যাচে নাভার্স থেকে বেরিয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন- কিন্তু সব শেষে গিয়ে গোলে কিক বা হেড করার মতো কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৪৬ থেকে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশের তিনটি চমৎকার আক্রমণ প্রতিহত করেছেন সিঙ্গাপুরের ডিফেন্ডাররা। পুরো ম্যাচে দারুণ খেলেছেন জিদান ইউসুফ। তাঁর সঙ্গে তারিক কাজী, সাদ আর জায়ান মিলেও একটা গোছানো ফুটবল খেলেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত গোলেই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারিত হয়, সেখানেই যত গোলকধাঁধা বাংলাদেশের। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তা মেনে নিয়েছেন কোচ থমাস ভুলি। 'আজকের খেলায় আমরা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিলাম এবং ৫০-৫০ বলগুলোতে জয়ী হয়েছি। আমাদের হয়তো ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো মানের কোনো অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার নেই, যা তৈরি করতে সময় লাগবে। তবে দলের এই উন্নতিতে আমি খুশি। মালয়েশিয়ার কাছে হার থেকে শিখে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে দল অনেক ভালো খেলেছে। আশা করি, ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচ থেকেও আমরা ইতিবাচক কিছু শিখতে পারব।'