খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবা। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে ছোট্ট মেয়েটি। তার হাতে চা আর রুটি। বাবার পাশে বসে রুটির টুকরো চায়ে ভিজিয়ে নিজের হাতে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। চারপাশে নানা কোলাহল। অথচ সেসবের কিছুই যেন মেয়েটির পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছিল না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন ক্ষুধার্ত বাবার দিকে। বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল বাজারে গত ২৬ সেপ্টেম্বরের এই দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি দোকানে চুরির চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয় কিছু মানুষ লোকটিকে আটকে রেখে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। সকালে তাঁর ৯ বছরের মেয়ে সেখানে এসে তার বাবাকে রুটি ও চা খাওয়ায়। পরে স্থানীয়রা মুচলেকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেয়।

খবরটি পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে পড়ল ১৯৪৮ সালের ইতালীয় চলচ্চিত্র ‘বাইসাইকেল থিভস’– ভিট্টোরিও দে সিকার কালজয়ী সিনেমা। যুদ্ধপরবর্তী দরিদ্র রোমের এক বেকার আন্তোনিও রিচি অনেক কষ্টে একটি চাকরি পায়। চাকরি টিকিয়ে রাখতে তার একটি বাইসাইকেল দরকার। পরিবারের প্রয়োজনের তাগিদে জোগাড় করা বাইসাইকেল প্রথম দিনেই চুরি হয়ে যায়। এরপর ছোট ছেলে ব্রুনোকে নিয়ে আন্তোনিও ছুটে বেড়ায় রোমের পথে পথে। সিনেমাটি বাইসাইকেল খোঁজার গল্প দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠে দারিদ্র্য, মর্যাদা, পিতৃত্ব এবং মানুষের অসহায়ত্বের গল্প। কিন্তু সিনেমাটির সবচেয়ে বেদনাময় মুহূর্ত আসে বাইসাইকেল হারানোর পর, যখন বাবার অসহায়ত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায় তার ছোট ছেলে ব্রুনো। শেষদিকে নিজের বাইসাইকেল হারানোর অসহায়তা, দারিদ্র্য ও হতাশার মধ্যে আন্তোনিও নিজেই অন্যের বাইসাইকেল চুরির চেষ্টা করে। কিন্তু ধরা পড়ে যায় ছেলের চোখের সামনে। সেই অপমানের মুহূর্তে সিনেমাটি যেন হঠাৎ অন্য অর্থ পায়। ব্রুনোর চোখে তখন তার বাবা কোনো ‘চোর’ নয়; একজন ভেঙে পড়া মানুষ।

প্রায় আট দশক পর, বাংলাদেশেও আমরা যেন সেই একই মানবিক বোধের বাস্তব প্রকাশ দেখতে পেলাম। সেখানে বাইসাইকেল নেই; আছে একটি খুঁটি। একটিতে ছোট ব্রুনো, অন্যটিতে ৯ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে। একদিকে বাবার হারিয়ে যাওয়া জীবিকার গল্প, অন্যদিকে চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা একজন মানুষ। গল্প দুটির প্রেক্ষাপট ও সময় আলাদা, তবু তাদের মাঝখানে একটি অদৃশ্য সেতু। সেই সেতুর নাম– সন্তানের চোখে বাবা। আইন একজন মানুষকে অভিযুক্ত বলতে পারে। আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। কিন্তু একটি শিশুর কাছে বাবা কোনো আইনি সংজ্ঞা নন। বাবা মানে নিরাপত্তা, আশ্রয়, ঘরের মানুষ। কিন্তু বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখে মেয়ের কাজটি অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে আনে– বাবা কি ক্ষুধার্ত? বাবা কি ব্যথা পেয়েছেন? এই সরল প্রশ্নটিই আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। একটি বাইসাইকেল হারালে একজন বাবার জীবন থমকে যেতে পারে। আর এক টুকরো রুটি একটি শিশুর হাতে সেই মুহূর্তে হয়ে উঠতে পারে বাবার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অমূল্য জিনিস। তাই বামরাইলের সেই দৃশ্যটি শুধু আবেগ জাগানো একটি ছবি নয়; এটি আমাদের সামনে রাখা একটি আয়না। একপাশে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা একজন মানুষ, অন্যপাশে তাঁর হাতে রুটি তুলে দেওয়া একটি শিশু। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের সমাজ– আইন, বিচারবোধ, দারিদ্র্য, জনতার উচ্ছ্বাস আর নীরবতার সমস্ত ভার নিয়ে। মেয়েটির হাতে ছিল এক টুকরো রুটি। অথচ সেই রুটির টুকরোটিই আমাদের সামনে তুলে ধরেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন– একজন বাবাকে অভিযুক্ত হিসেবে দেখার আগে মানুষ হিসেবে দেখার মতো জায়গা কি আমাদের সমাজে এখনও আছে?

আইন তার কাজ করবে। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হবে যথাযথ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু সেই ছোট্ট মেয়েটির চোখে আমরা যে সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখেছি, তার বিচার কোনো আদালত করবেন না। সেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে আমাদেরই। কারণ তার হাতে ছিল শুধু রুটি নয়– একটি সমাজের বিবেক।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]