জোছনা ছড়িয়ে আছে হাওরের বিস্তীর্ণ জলে। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, জল আর জল। নীরবতার বুক চিরে হঠাৎ ভেসে আসে নানান বাদ্যযন্ত্রের সুর। সেই সুরের সঙ্গে মিশে যায় লোকগানের টান, কথকের কণ্ঠ আর অভিনয়ের সংলাপ। এটি কোনো প্রচলিত মঞ্চ নয়; খোলা আকাশের নিচে টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশিই হয়ে ওঠে মঞ্চ। পূর্ণিমার এমন মায়াময় রাতে মঞ্চায়িত হলো চন্দ্রাবতী রচিত বাংলার অমর লোকগাথা ‘মলুয়া’।

শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরে ‘মলুয়া’ মঞ্চস্থ করে থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি। হাউস বোটে এ আয়োজন করে উল্লাস ট্রাভেলস। হাওরের প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে লোকগাথার পুরোনো আখ্যানকে নতুন এক পরিবেশনায় দর্শকের সামনে হাজির করা হয়। গল্প, পালাগান, গান, কথকতা ও লোকনৃত্যের সমন্বয়ে সাজানো প্রযোজনাটিতে উঠে এসেছে প্রেম, সাহস, আত্মত্যাগ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই।

মৈমনসিংহ গীতিকার অমর পালা ‘মলুয়া’র ভাষ্যবয়ান ও নির্দেশনায় রয়েছেন সাইফুল জার্নাল। পুরোনো লোকগাথাকে নতুন সময়ের ভাষা ও দৃশ্যরীতিতে উপস্থাপনের পাশাপাশি লোকনাট্যের আদি আঙ্গিকের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা রয়েছে তাঁর ভাবনায়। হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশে সেই ভাবনাই পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। চাঁদের আলো, হাওরের জল আর লোকবাদ্যের সুর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকটির নিজস্ব আবহ।

নির্দেশক সাইফুল জার্নাল বলেন, ‘এই সময়ে মিউজিকের আদি ও প্রকৃত পারফরম্যান্সটা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পালা, পুঁথি, গাজির গীত– যা একসময় ছিল বাংলার প্রাত্যহিক পালনের পরম্পরা, পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে এখন এর আয়োজন প্রায় শূন্য। আর যা-ও হয়, তা অপভ্রংশ। আমরা থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি সেই আদি লোক আঙ্গিকের মূল নির্যাসটুকু নিয়ে তা আধুনিক মঞ্চে পুনরায় সৃষ্টি করতে।’

চন্দ্রাবতীর ‘মলুয়া’র কেন্দ্রে রয়েছে প্রেমের আখ্যান। তবে প্রেমের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ কাহিনি ছুঁয়ে যায় সমাজের নানা বাস্তবতাকে। সামাজিক বৈষম্য, মর্যাদার প্রশ্ন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং প্রতিকূলতার মুখে মানুষের লড়াই– সবই এর মধ্যে বিস্তৃত পরিসরে উপস্থিত। বিশেষ করে মলুয়া চরিত্রের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নারীর দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার শক্তি। তিনি কেবল প্রেমিকা বা স্ত্রী নন; লাঞ্ছনা, প্রতিকূলতা ও ক্ষমতাবানদের অত্যাচারের মধ্যেও সততা, মর্যাদা ও মানবিক শক্তি ধরে রাখা এক দৃঢ়চেতা নারী। সেই পুরোনো আখ্যানই টাঙ্গুয়ার হাওরের জোছনা রাতে নতুন পরিবেশে ফিরে আসায় অতীত ও বর্তমানের মধ্যে তৈরি হয় এক অন্যরকম সেতুবন্ধ। লোকগাথার গল্প যেমন বহমান থাকে, তেমনি তার ভেতরের প্রশ্নগুলোও সময় পেরিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করে। ‘মলুয়া’ তাই শুধু একটি প্রেমের গল্প হয়ে থাকেনি; নারীর মর্যাদা, সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার ব্যবহারের মতো বিষয়ও নতুন করে সামনে এনেছে।

উল্লাস ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী হাসানুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছি মাটির ও শিকড়ের সংস্কৃতিকে ধারণ করে পূর্ণিমা রাতে এই আয়োজনটা করতে। পর্যটক হিসেবে যারা হাওরে ঘুরতে আসেন, তাদের জন্য বিনোদনের নানা রকম ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু আমরা এবার মাটির সুরে নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছি। আমাদের দেশীয় সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে ধারণ করে আনন্দ উদযাপন করেছি। সম্ভবত এই প্রথম টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউস বোটে কোনো থিয়েটার প্রদর্শনী হলো।’