VoiceBD অনলাইন ডেস্ক: জার্মান রাজনীতির দুই বিপরীত মেরুর উত্থান নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এ সংক্রান্ত ঘটনাবলী বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে।

জার্মানির রাজনীতি এক অদ্ভুত আয়নায় দাঁড়িয়ে আছে। ২০ সেপ্টেম্বর দুই রাজ্য নির্বাচনের ফল একসঙ্গে দুটি ভিন্ন গল্প বলছে। বার্লিনে সবচেয়ে বড় দল হয়েছে বামপন্থি ডি লিঙ্কে, আর উত্তর-পূর্বের মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়াতে রাজ্যে জিতেছে অতি-ডানপন্থি এএফডি। একই দিনে, একই দেশে দুই বিপরীত মেরুর জয় খুবই বিস্ময়ের। দুই ফলের পেছনে আছে একই ধরনের অসন্তোষ কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। বার্লিনে ডি লিঙ্কে ২৬ শতাংশ ভোট পেয়ে শীর্ষস্থানে। এর মূল কারণ আবাসন সংকট আর ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি। জরিপ বলছে, সাশ্রয়ী আবাসনের প্রশ্নে ভোটাররা বেশি ভরসা করেছে এই দলের ওপর। চমকপ্রদ বিষয় হলো, এবার প্রথমবারের মতো ১৬-১৭ বছর বয়সীরাও ভোট দিয়েছে, আর তরুণ ভোটারদের বিশাল অংশ ঝুঁকেছে বামপন্থার দিকে। যে ক্রয়ৎসবার্গ এলাকা দশকের পর দশক ধরে গ্রিন পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও এবার সব আসন জিতে নিয়েছে ডি লিঙ্কে। অর্থাৎ পুরোনো রাজনৈতিক মানচিত্র হঠাৎই বদলে যাচ্ছে ডি লিঙ্কে আর শুধু পূর্ব বার্লিনের প্রবীণদের দল নয়, এটি এখন নগরকেন্দ্রিক তরুণ আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে এসপিডি ছিল শ্রমিকদের দল। এবার তাদের সমর্থন নেমে এসেছে মাত্র ৬ শতাংশে। সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে দুই প্রান্তিক শক্তি এএফডি ৩০ শতাংশ আর ডি লিঙ্কে ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষ মধ্যপন্থি দলগুলোর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে দুই বিপরীত মেরুতে ছুটছেন। মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়াতে এএফডি পেয়েছে ৩৭ শতাংশের বেশি ভোট, আর ঐতিহ্যবাহী সিডিইউ পড়েছে ঐতিহাসিক দুর্বলতায়। এই ফলকে শুধু ‘অভিবাসনবিরোধী মনোভাব’ বলে ফেলা ঠিক হবে না। এর পেছনে আছে জার্মান একত্রকরণের পর তিন দশকের অসম অভিজ্ঞতা। কর্মসংস্থানের ব্যবধান কমলেও পূর্বে বেকারত্ব ৮.৬ শতাংশ, পশ্চিমে ৬.৪ শতাংশ কিন্তু সম্পদের ব্যবধান এখনও বিশাল। পূর্ব জার্মানির গড় পারিবারিক সম্পদ পশ্চিমের প্রায় অর্ধেক। তার ওপর ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছেন। এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা আর রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থাই এএফডি’র উত্থানের মূল জমিন তৈরি করেছে। তাহলে জার্মানিতে কি সত্যিই একসঙ্গে বাম আর ডান দুই প্রান্তের উত্থান ঘটছে? উত্তর হ্যাঁ, কিন্তু এটি দুই আলাদা আন্দোলন নয়, একই রাজনৈতিক সংকটের দুই ভিন্ন প্রকাশ। বার্লিনে ভোটাররা যে ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা হলো সামাজিক ন্যায় আর আবাসনের ভাষা। আর পূর্বাঞ্চলে সেই একই ক্ষোভ রূপ নিয়েছে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় আর রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসের ভাষায়। দুটোর মূল কথা একটাই, মধ্যপন্থি দলগুলোর প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়েছে। জার্মান রাজনীতির বহুদিনের কিছু ‘ধ্রুব সত্য’ আর টিকছে না। ক্রয়ৎসবার্গ এখন আর গ্রিনদের নয়। ডি লিঙ্কে এখন আর শুধু বয়স্কদের নয়। এসপিডি’কে এতদিন যে ‘চিরস্থায়ী বার্লিন পার্টি’ ভাবা হতো, সেই পরিচয়ও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি শহরের ভোটের মানচিত্রও বদলে গেছে। আগে ছিল কেন্দ্রে গ্রিন, বাইরে কালো; এখন কেন্দ্রে লাল (ডি লিঙ্কে), আর চারপাশে পশ্চিমে কালো (সিডিইউ) আর পূর্বে নীল (এএফডি)। অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিম বিভাজনের পুরোনো রেখা মুছে গিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন এক বিভাজন বয়স, সামাজিক শ্রেণি আর রাজনৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে। ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে রাজ্য নির্বাচন জার্মানির রাজনীতিকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এক. মধ্যপন্থি রাজনীতি কতদিন টিকবে? দুই. প্রচলিত দলগুলো কি জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ও অভিবাসনের সমাধান দিতে পারবে? তিন. শহর-গ্রাম, পূর্ব ও পশ্চিমের ভিন্ন বাস্তবতায় জাতীয় রাজনীতি কীভাবে ভারসাম্য রাখবে? এই ফলকে কোনো একক দলের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা যে, জার্মান ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রচলিত রাজনীতির প্রতি আস্থা হারিয়ে বিকল্প খুঁজছে। কেউ খুঁজছেন সামাজিক ন্যায় আর আবাসনভিত্তিক বাম রাজনীতি, কেউ খুঁজছেন পরিচয় আর নিরাপত্তাভিত্তিক ডান রাজনীতি। এই দুই পথই ভিন্ন গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু যাত্রা শুরু হয়েছে একই জায়গা থেকে। জার্মান গণতন্ত্রের জন্য প্রকৃত পরীক্ষা তাই বাম বা ডানের জয়-পরাজয় নয়। বরং প্রশ্নটি হলো–প্রচলিত দলগুলো কি এই বিভাজিত সমাজকে নতুন করে এক ছাতার নিচে আনতে পারবে, নাকি প্রান্তিক শক্তিগুলো ক্রমে হয়ে উঠবে জার্মান রাজনীতির নতুন কেন্দ্র? মঞ্জুরে খোদা: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীল মহল মনে করছেন, এই পরিস্থিতির অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। পুরো ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে এবং পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

VoiceBDNews পাঠকদের জন্য এই ঘটনার সর্বশেষ ও বস্তুনিষ্ঠ সব আপডেট সবার আগে তুলে ধরছে।