রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রবন্ধসাক্ষাৎকারঅনুবাদবই আলোচনানথিপত্রআর্কাইভ বই আলোচনাআলী রীয়াজ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস, আদর্শিক সংকট ও সংস্কার: একটি গ্রন্থালোচনাআপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ৪৩ বইয়ের নাম: Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics; লেখক: ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক; প্রকাশক: The University Press Limited (UPL); প্রকাশস্থান: ঢাকা; প্রকাশকাল: ২০২৬; পৃষ্ঠা: ২৪২; আইএসবিএন: 978-984-506-576-4; মূল্য: ৳১,১৬০
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস বইটি কার্যত দুটি ভাগে বিভক্ত বলে আমার মনে হয়েছে এবং আমি সেইভাবেই বইটি পাঠ করেছি। বইয়ের লেখক বা প্রকাশক বইটি দুভাগে বিভক্ত বলছেন না। প্রথম ভাগ হচ্ছে প্রথম চারটি অধ্যায়; এবং দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে বইয়ের পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম অধ্যায়। স্বীকার করা করা দরকার যে আমি এই বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ প্রথমে পড়েছি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে বইয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম। ভূঁইয়া মোহাম্মদ মনোয়ার কবিরের পলিটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ (কবির ২০০৬), মাইদুল ইসলামের লিমিটস অব ইসলামিজম: জামায়াতে ইসলামী ইন কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ (ইসলাম ২০১৫) এবং সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম সম্পাদিত গ্রন্থ দ্য জামায়াত কোয়েশ্চন ইন বাংলাদেশ: ইসলাম, পলিটিকস অ্যান্ড সোসাইটি ইন আ পোস্ট-ডেমোক্রেটিক নেশন (ইসলাম ও ইসলাম ২০২৩) জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বই। এর বাইরে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ইরফান আহমেদের ইসলামিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন ইন্ডিয়া: দ্য ট্রান্সফরমেশন অব জামায়াতে ইসলামী (আহমদ ২০০৯) বইয়ে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী বিষয়ে আলোচনা আছে। এর মানে এই নয় যে জামায়াতে ইসলামী বিষয়ে আলোচনার ঘাটতি আছে, বরং বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ইসলামপন্থী রাজনীতিবিষয়ক আলোচনা, বই, প্রবন্ধ ও নিবন্ধে জামায়াতের সাংগঠনিক দিক, আদর্শিক অবস্থান ও রাজনীতির প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবেই এসেছে। রাজনৈতিক আলোচনাগুলো—যাতে জামায়াতের তীব্র সমালোচনা আছে এবং আবার তার প্রতি দ্বিধাহীন সমর্থনও আছে—বাদ দিলেও জামায়াতের বিষয়ে আলোচনাগুলো বাইরে থেকে দেখা। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামীকে গবেষকেরা যেভাবে দেখেছেন, সেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বিদ্যায়তনিক আলোচনায় সেটাই স্বাভাবিক।
এযাবৎ জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, তাঁরা তাঁদের অবস্থান থেকে জামায়াতের ইতিহাস, তার সাফল্য-ত্রুটিবিচ্যুতি বলার চেষ্টা করেননি। আবদুর রাজ্জাক সেই চেষ্টা করেছেন। এই জায়গায় বইটি সবার চেয়ে আলাদা। এই বইয়ের প্রথম চারটি অধ্যায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস এবং এর সঙ্গে লেখকের সংযুক্তি, অংশগ্রহণ, বিতর্ক এবং পদত্যাগের বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইটাই প্রথম, যা এই দলকে আমাদের সামনে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছে। আবদুর রাজ্জাকের বইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে জামায়াতে ইসলামী একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অনস্বীকার্য, কিন্তু দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সে যে অতীতকে এড়িয়ে আছে, তার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত কি না তার ওপরে (রাজ্জাক ২০২৬: ১৮৫)।
আবদুর রাজ্জাক তাঁর বইয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে জামায়াতের কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্তের আলোচনা করার আগে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। যাকে তিনি বলেছেন নেতৃত্বের ঘাটতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয় (তাঁর ভাষায় ‘লিডারশিপ ডেফিসিট অ্যান্ড ইন্টেলেকচুয়াল ডিকলাইন’)। ‘জামায়াত কেন গত ৮০ বছরে স্বপ্নদর্শী (ভিশনারি) নেতা তৈরি করতে পারেনি?’ এই ধরনের নেতার উদাহরণ হিসেবে তিনি রাশেদ ঘানুচি, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন যে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো এবং কর্মসূচি এই ধরনের নেতার বদলে কর্মী তৈরি করে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াতের ভেতরে ক্রমাগতভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষয় হয়েছে। তিনি মনে করেন যে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ফলেই এই ক্ষয় হয়েছে (রাজ্জাক ২০২৬: ১০)। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে জামায়াতের কর্মসূচি চারটি—১. দাওয়াত ও তাবলিগ (চিন্তার পরিশুদ্ধি ও পুনর্গঠন), ২. সংগঠন ও প্রশিক্ষণ, ৩. সমাজসংস্কার ও সমাজসেবা, ৪. রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সংশোধন। শেষটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী।
প্রথম চারটি অধ্যায়ের যে বিষয় প্রধান হয়ে উঠছে, তা হচ্ছে ১৯৭১ সাল প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং এই প্রশ্নে সুস্পষ্টভাবে বিরোধী ভূমিকা নেয়। ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁর বইয়ে জানাচ্ছেন যে ১৯৯৩ সাল থেকেই ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন দলের ভেতরে আলোচনা ছিল। আবদুর রাজ্জাক যেমন জানান, প্রকৃতপক্ষে এই আলোচনার সূত্রপাত ১৯৭৬ সালে আইডিএল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল জামায়াতের সংস্কার। ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক দলবিধির (পিপিআর) আওতায় আবেদন করেও জামায়াত অনুমোদন পায়নি, কিন্তু ১৯৭৮ সালে জামায়াত নেতা গোলাম আযম বাংলাদেশে আসার পরে তিন বছর আগে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ১৯৭৯ সালে জামায়াতের উত্থান ঘটানো হয়েছিল। এই আলোচনার সূত্র ধরেই ১৯৮২ সালে মাওলানা আবদুল জাব্বার এবং ছাত্রশিবির নেতা আহমদ আবদুল কাদের বাচ্চুর নেতৃত্বে দলের একাংশকে আলাদা করে ইসলামী যুব শিবির তৈরি করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে আবদুর রাজ্জাক এবং অন্যরা এই ক্ষমাপ্রার্থনার বিষয় সামনে আনেন।