পেটে ক্ষুধা, বাবার মাথায় এনজিওর কিস্তির বোঝা আর বাবার দিনমজুরি এমন চরম বাস্তবতা প্রতিদিন চোখ রাঙাত নৃগোষ্ঠীর কাজল পাড়ের সামনে। তাইতো তিনি নিজেও এই লেখাপড়াকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে অর্থ ইনকামের জন্য টিউশনি করাসহ বিভিন্ন কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। অভাব অনটনের মধ্যেই নিজেকে করে তোলেন যোগ্য শিক্ষার্থী হিসেবে। অভাবের সেই অন্ধকারকে দূরে ঠেলে প্রত্যন্ত একটি গ্রামে ইতিহাস গড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার কাজল পাঁড়ে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

কাজলের এই জয়ে প্রায় দুই যুগেরও আগে গড়ে ওঠা পার্বতীপুর ইউনিয়নের মাধাইপুর গ্রামের দীর্ঘদিনের অন্ধকার কাটল। কারণ, গ্রামটিতে এতদিন কোনো সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন না; সেই খরা কাটিয়ে প্রথম সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিচারকের আসনেই বসতে যাচ্ছেন অদম্য এই তরুণ। এ জন্য গ্রামবাসীও খুব খুশি, কাজলকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন তারা।

জানা গেছে, মাধাইপুর গ্রামের ‘তুরি’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিহীন কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে কাজল। অভাবের তাড়নায় তার তিন বোনের পড়াশোনা প্রাথমিকে পৌঁছানোর আগেই থেমে গিয়েছিল, অল্প বয়সেই দিতে হয়েছিল বিয়ে। অনেক দিন এমনও কেটেছে-ঘরে খাবার না থাকায় না খেয়েই স্কুলে গিয়েছেন কাজল। ভূমিহীন কৃষক পরিবারের একমাত্র সন্তান কাজলের পথচলা সহজ ছিল না।

কাজলের শিক্ষাজীবন শুরু করেছিল স্থানীয় মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। এরপর মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজে থেকে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া শেষ করেন। এরপরই উচ্চশিক্ষার যুদ্ধে নামেন তিনি। প্রথমবার হোঁচট খেলেও দ্বিতীয়বারে বাজিমাত করে একযোগে জগ্ননাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান। ভর্তি হন রাবির আইন বিভাগে।

ছেলের পড়ার খরচ যোগাতে বাবা নরেশ পাঁড়েকে নামতে হয়েছে কঠিন লড়াইয়ে। এনজিওর কিস্তি তোলা থেকে শুরু করে বাড়িতে গরু বিক্রিসবই করেছেন। মানুষের দয়া না চেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে গিয়ে কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির কঠোর শ্রমিকের কাজ বেছে নেন, সেই মজুরির টাকায় ছেলের শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। অন্যদিকে, কাজলও ক্যাম্পাসে টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। অবশেষে ১৮তম বিজেএস অর্জন করে সব কষ্টের হিসাব চুকিয়েছেন কাজল।

জেলার গোমস্তাপুরের মাধাইপুর গ্রামের ‘তুরি’ নৃগোষ্ঠীর সন্তান কাজল পাঁড়ে আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গত ২২ বছরে সরকারি চাকরি না পাওয়া প্রত্যন্ত এই গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ২০০ জনের মধ্যে ১৪০তম স্থান অর্জন করে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার এই অর্জনে পুরো গ্রামে বইছে আনন্দের জোয়ার। গ্রামবাসীরাও তাই খুশি। যোগ্য সন্তানকে তারা উৎসবের আমেজে ঘরে তুলে নিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, মেধাবী কাজলের অদম্য ইচ্ছে আর সাহসীকতার কারণেই তিনি যোগ্যস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন।