রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি পাঠকস্মৃতির শবদাহলেখা: কে এম ফারহাত স্নিগ্ধপ্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ১২ অলংকরণ: মাসুক হেলালসন্ধ্যা নামিয়া আসিয়াছে। নির্জন ঘরের আধো অন্ধকারে জানালার গরাদে মাথা ঠেকাইয়া অতুল স্তব্ধ হইয়া বসিয়া আছে। গোধূলির ম্লান আলোয় একটিমাত্র প্রশ্ন বারবার তাহার বুকের ভেতর শূন্য মন্দিরের ঘণ্টার ন্যায় প্রতিধ্বনিত হইতেছে—‘এই বৃষ্টি যতবার নামিবে, ততবার কি আমার কথা আপনার মনে পড়িবে না?’
প্রশ্নটি যে করিয়াছিল, সে আজ অনেক দূরে। কিন্তু যাইবার বেলায় সে যে অমোঘ সত্যটি উচ্চারণ করিয়া গিয়াছিল, আজ এই নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় তাহা অক্ষরে অক্ষরে ফলিতেছে। সে বলিয়াছিল, ‘ভুলিয়া যাওয়া মানে তো কেবল মনে না রাখা নয়। আমি বলিতে চাহিতেছি, আমার সহিত জড়াইয়া থাকা সেই দিনগুলোর স্মৃতি কি তোমার ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়িবে না?’
অতুল আজন্ম ভাবিয়া আসিয়াছে, সময়ের প্রলেপে বোধ করি পৃথিবীর সকল ক্ষত শুকাইয়া যায়। চোখের আড়াল হইলেই বুঝি মনের আড়াল হওয়া যায়। কিন্তু আজ সে বুঝিতেছে, স্মৃতির কাছে মানুষের অহংকার কতখানি তুচ্ছ। স্মৃতি তো সস্তা খাতায় লিখিয়া রাখা বাজারের হিসাব নহে যে পাতা ছিঁড়িয়া ফেলিলেই তাহা মুছিয়া যাইবে। স্মৃতি হইল ফাল্গুনের সেই ঝরা পাতার মতো—প্রবল বাতাসে যাহাকে উড়িয়া যাইতে দেখিলেও তাহার শূন্য স্থানটি চিরকাল বৃক্ষের ডালে এক নীরব হাহাকার হইয়া থাকিয়া যায়।
ভুলিতে সে হয়তো অনেক কিছুই পারিয়াছে। সেই মানুষটির কণ্ঠস্বর হয়তো আজ আর ততটা স্পষ্ট নহে, তাহার হাসির শব্দ হয়তো স্মৃতির পাতায় খানিকটা ঘোলাটে হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু ওই যে সে বলিয়াছিল, ‘স্মৃতিগুলো কি মনে পড়িবে না?’—সত্য বটে, যখনই বর্ষার প্রথম জল তপ্ত মাটিতে আসিয়া পড়ে, কিংবা শরতের কোনো নির্জন দ্বিপ্রহরে দূর হইতে উদাস করা কোনো সুর ভাসিয়া আসে, তখনই বুকের ভেতরটা অকস্মাৎ হু হু করিয়া ওঠে। এক তীব্র শূন্যতা আসিয়া গলা চাপিয়া ধরে।
পিতার মৃত্যুর পর অতুলের সংসারে দারিদ্র্যই একমাত্র নিত্য অতিথি। প্রত্যহ প্রভাতে দুই ক্রোশ পথ হাঁটিয়া সে সদরের ইস্কুলে পড়াইতে যায়, সন্ধ্যায় ফিরিয়া রুগ্ণ মায়ের পথ্যের জোগাড় করে। গ্রামের লোকে বলে, ছেলেটি বড় শান্ত, বড় লাজুক। কেবল অতুল জানে, উহা লজ্জা নহে—দারিদ্র্যের সংকোচ। যে মানুষকে নিজের ছেঁড়া চটি জোড়া লুকাইয়া চলিতে হয়, বড়লোকের উঠানে দাঁড়াইয়া সে গলা তুলিয়া কথা কহিতে পারে না।
বিভারা এ গ্রামে আসিয়াছিল বৎসর তিনেক পূর্বে। তাহার পিতা সরকারি চাকুরে; কাছারি-সংলগ্ন বড় বাড়িটিতে তাহারা বাস করিত।