শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল বাঁচিয়ে রাখা, তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা জরুরি
প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার একটি মজার দিক রয়েছে। প্রতিদিন স্কুলে বা শ্রেণিকক্ষে ওদের দেখে নতুন কিছু শিখি-জানি। স্কুলে দীর্ঘদিন কাজের কারণে ওদেরকে বেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। চোখে পড়েছে ওদের সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে যা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে– ছোট্ট শিশুদের মধ্যে বড়দের মতো কোনো দ্বিধা, জড়তা বা সংকোচ নেই।। তারা বিনা দ্বিধায় যে কোনো প্রশ্ন করে। কোনো কিছু ভালো লাগলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দ প্রকাশ করে। ভালো না লাগলে তাও লুকোয় না। চারপাশের পৃথিবীকে তারা অসীম কৌতূহল নিয়ে দেখে। আর বড়রা ওদের সামনে যা করেন বা বলেন, তা তারা খুব দ্রুত অনুকরণ করার চেষ্টা করে। মনোবিজ্ঞান বলছে, মানসিক, সামাজিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্যের বিকাশের জন্য জীবনের প্রথম কয়েক বছর ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় শিশুর চারপাশের পরিবেশ, বড়দের বা অন্যদের আচরণ, নিরাপত্তা বোধ ও শেখার অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই বয়সে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল বাঁচিয়ে রাখা, তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা জরুরি। দিনের একটা বড় সময় যেহেতু শিশুরা বিদ্যালয়ে কাটায়, তাই পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষকদের ভূমিকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদাতা নন, এক ধরনের আদর্শ বা রোল মডেল। তিনি কীভাবে কথা বলছেন, কোনো ভুলের পর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, অন্যকে কীভাবে সম্মান করছেন কিংবা সাহায্য করছেন– শিশুরা এসবই খুব মন দিয়ে দেখে। আমাদের সমাজে শিশুদের ক্ষেত্রে এখনও কঠোরতাকে শাসনের একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়। শিশু কথা শুনছে না, পড়া মুখস্থ হয়নি কিংবা কোনো ভুল করেছে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে বকা দেওয়া, সবার সামনে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা গায়ে হাত তোলার ঘটনাও বিরল নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে সেই পরিচিত চিরাচরিত যুক্তি– ‘শাসন না করলে মানুষ হবে কীভাবে?’ শিশুর কাছে এই অভিজ্ঞতা কতটা ভয়ংকর, তা কি আমরা ভেবে দেখি? যে শিশুটি মাত্র পৃথিবীকে চিনতে শুরু করেছে, তার কাছে শিক্ষক বা অভিভাবক যদি নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে ভয়ের মানুষ হয়ে ওঠেন, তাহলে সে ভুল করতে, প্রশ্ন করতে কিংবা নিজের কথা বলতে ভয় পাবে বা দ্বিধায় পড়বে। ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে তার স্বাভাবিক কৌতূহলও। অথচ শেখার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এই কৌতূহল। আমার শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, এই বয়সে কঠোর নিয়মানুবর্তিতার চেয়ে ধৈর্য ও আন্তরিকতা বেশি প্রয়োজন। শিক্ষককে শিশুর কাছে যেতে হয়– কখনও বন্ধুর মতো, কখনও অভিভাবকের মতো। একটি শিশু যখন বুঝতে পারে যে ভুল করলেও তাকে অপমান করা হবে না, তখন সে ধীরে ধীরে নির্ভয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে শেখে। অবশ্যই বর্ণমালা শেখাতে হবে, সংখ্যা চিনতে হবে, নামতা শিখতে হবে। পড়াশোনার ভিত্তি শক্ত করাও জরুরি। কিন্তু শিক্ষাকে যদি শুধু বইয়ের পাতার জ্ঞান বা মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তাহলে শেখার একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। অন্যের কথা শোনা, নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা, বন্ধুর প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, ভুল হলে দুঃখিত বলা, অন্যে ভালো করলে খুশি হওয়া– এসবও শিক্ষার অংশ। জীবনের জন্য এসব গুণের প্রয়োজন অনেক বেশি। আমাদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো একেবারে অকার্যকর নয়। তবে সময় বদলেছে, শিশুদের শেখার ধরনও বদলেছে। তাই খেলার ছলে শেখা বা প্লে-বেসড লার্নিং, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং শ্রেণিকক্ষের দৈনন্দিন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মূল্যবোধের চর্চা আরও বাড়ানো দরকার। এখানে আমরা প্রায়ই শিশুর ভালো ফল নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কে কতটা পড়া মুখস্থ করেছে, পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে, কে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে– এসব নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত, শিশুটি কেমন মানুষ হয়ে উঠছে। সে কি অন্যের অনুভূতি বুঝতে শিখছে? নিজের কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারছে? ভুল করলে আবার চেষ্টা করার সাহস পাচ্ছে? অন্যকে সম্মান করছে? কারও কষ্ট দেখলে তার মনেও কি একটু কষ্ট হচ্ছে? একটি শিশুকে ভালো ফলের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেওয়ার চেয়ে তাকে সংবেদনশীল, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ফল হয়তো তাকে একটি পরীক্ষায় এগিয়ে দেবে, কিন্তু মানবিকতা তাকে জীবনের অনেক দূর নিয়ে যাবে। সেই মানবিকতার বীজ বপনের সময় তো এই শৈশবেই। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের একটি স্নেহমাখা দৃষ্টি, ভুল করার পর আরেকটি সুযোগ কিংবা মন দিয়ে শোনা তার প্রশ্ন– শিশুর কাছে এগুলোর মূল্য হয়তো আমরা যতটা ভাবি, তার চেয়েও বেশি। তাই শিশুকে কী শেখাচ্ছি, সেটা খুব জরুরি। আমাদের নিজেদের নিরন্তর প্রশ্ন করা দরকার– শিশুদের সামনে আমরা নিজেদের ওদের রোল মডেল বা আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছি কিনা?
সুমনা করিম: ভাইস প্রিন্সিপাল, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল
ই-মেইল: [email protected], [email protected]