চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্টের মধ্যে আন্তঃপেশাগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ
২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘এমপাওয়ারিং ফার্মাসিস্টস ফর হেলদিয়ার ফিউচারস’। অর্থাৎ সুস্থতর ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের আরও কার্যকরভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন। বিশ্বের অনেক দেশে ফার্মাসিস্ট এখন আর শুধু ওষুধ সরবরাহকারী নন। তারা রোগীর ওষুধ ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞ। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে সমন্বয় করে তারা ওষুধের সঠিক ব্যবহার, ডোজ নির্বাচন, ওষুধ ব্যবহারের পর্যালোচনা, রোগীকে ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে কাজ করেন। অর্থাৎ আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ফার্মাসিস্টের জায়গা শুধু ওষুধের দোকান বা সরবরাহ ব্যবস্থায় নয়; বরং রোগীর পাশেও। যদিও বাংলাদেশে চিত্রটি এখনও ভিন্ন। তবে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি সেবা নেই– এ কথা বলা ঠিক হবে না। কিছু বেসরকারি ও আধুনিক হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশে বেসরকারি বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা হাসপাতালে দলভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি সেবা চালুর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই ধরনের সেবা এখনও দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থায় ব্যাপক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ যে হাসপাতালে ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত এত জটিলতা থাকলে ওষুধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ফার্মাসিস্টকে কেন নিয়মিতভাবে চিকিৎসা দলের অংশ করা হবে না? একজন রোগী একই সময়ে একাধিক ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন। বয়স, কিডনির কার্যক্ষমতা, লিভারের অবস্থা, অন্য ওষুধের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া– এসব বিবেচনায় ওষুধের ব্যবহার আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞ ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট চিকিৎসকের বিকল্প নন; বরং তাঁর ওষুধ সংক্রান্ত দক্ষতা চিকিৎসা দলকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। রোগীর জন্যও এর অর্থ হতে পারে নিরাপদ ও যৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার। পাশের দেশ ভারত এ ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। দেশটিতে ফার্মেসি পেশা চর্চার বিধিমালা রয়েছে এবং সেখানে হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট-এর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ফার্মেসি পেশা চর্চার বিধিমালায় ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট- এর যোগ্যতার ক্ষেত্রেও সংশোধন আনা হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশে বাধা কোথায়? প্রথমত, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির ভূমিকা নিয়ে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আরও প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় পদ ও পরিষ্কার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়নি। তৃতীয়ত, ফার্মেসি শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের আরও ঘনিষ্ঠ সংযোগ দরকার। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্টের মধ্যে আন্তঃপেশাগত সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। সমাধানও অসম্ভব নয়। শুরু হতে পারে কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বড় বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি সেবা চালুর মাধ্যমে। নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্মপরিধি, প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট, ওষুধ ব্যবহারের পর্যালোচনা, রোগীর ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা যাচাই ও সমন্বয়, ওষুধের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মতো সেবা ধাপে ধাপে চালু করা যেতে পারে। এরপর রোগীর নিরাপত্তা, ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এটি কোনো পেশার সঙ্গে অন্য পেশার প্রতিযোগিতা নয়। বরং চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় নার্স রোগীর সার্বিক পরিচর্যায় এবং ফার্মাসিস্ট ওষুধের নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহারে নিজ নিজ দক্ষতা নিয়ে একই দলের অংশ হতে পারেন। বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে তাই শুধু ফার্মাসিস্টদের শুভেচ্ছা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের ভাবতে হবে যে দেশে হাজার হাজার ফার্মাসিস্ট তৈরি হচ্ছে, সেই দেশের হাসপাতালগুলোতে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার কতটা আমরা রোগীর কাজে লাগাতে পারছি? এবারের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্যও একটি সুযোগ। ফার্মাসিস্টকে শুধু ওষুধের সঙ্গে নয়, রোগীর সঙ্গে এবং স্বাস্থ্যসেবার মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার সময় এসেছে। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হয় ওষুধের নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহার। আর নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের প্রশ্নে ফার্মাসিস্টকে বাইরে রেখে সেই নিরাপত্তা কতটা পূর্ণ হতে পারে– সেটিই এখন আমাদের ভাবার বিষয়।
আরমান ইসলাম রোমান: ফার্মাসিস্ট ও এম.ফিল গবেষক, ডিপার্টমেন্ট অব ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]
ই-মেইল: [email protected], [email protected]