দুই যুগ আগে নলকূপের গায়ে লাল রঙের দাগ দিয়ে সতর্ক করে লেখা হয়েছিল–এই পানি পান করা যাবে না। কারণ, পরীক্ষায় পাওয়া গিয়েছিল মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। সময়ের সঙ্গে সেই লাল দাগ মুছে গেছে। নলকূপের পানিতে থাকা আর্সেনিকের ঝুঁকি কাটেনি। বরং বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকায় পুরোনো সেই নলকূপের পানি ব্যবহার করছেন মানুষ। ফলে বগুড়ার ধুনট, গাবতলী ও শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৬ লাখ মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কোন নলকূপে একসময় লাল দাগ দেওয়া হয়েছিল, এখন তা বোঝার উপায় নেই। নতুন প্রজন্মের অনেকে জানে না কোনটির পানি ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে অজান্তে শরীরে ঢুকছে বিষাক্ত আর্সেনিক।

জনস্বাস্ব্য অধিপ্তরের বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘পুরোনো চিহ্ন মুছে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপগুলো পুনরায় পরীক্ষা ও চিহ্নিত করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আর্সেনিক মিটিগেশন ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের আওতায় পল্লী-কর্মসহায়ক সংস্থা (পিকেএসএফ) ২০০৩ সালে জেলার ধুনট, গাবতলী ও শিবগঞ্জ উপজেলায় নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পরীক্ষা চালায়। ওই সময় তিন উপজেলার ৬২৭টি গ্রামের প্রায় দেড় লাখ পরিবারের ব্যবহৃত ৪৫ হাজার নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৭ হাজার ৮২৩টি নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়।

ধুনট উপজেলার ২৪৩টি গ্রামের ২ হাজার ৭৩২টি নলকূপে আর্সেনিক শনাক্ত হয়। এর মধ্যে মথুরাপুর গ্রামে পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই গ্রামের ৩৭০টি নলকূপে আর্সেনিক পাওয়া যায় এবং ৬৩ জনকে আর্সেনিক আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপগুলো যাতে মানুষ ব্যবহার না করে, সে জন্য সেগুলোর গায়ে লাল রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। গাবতলী উপজেলার ২১৭টি গ্রামের ২ হাজার ৩১৬টি এবং শিবগঞ্জ উপজেলার ১৬৭টি গ্রামের ২ হাজার ৫১৮টি নলকূপেও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়। এসব নলকূপেও দেওয়া হয়েছিল সতর্কতার লাল চিহ্ন। কয়েক বছরের মধ্যে অধিকাংশ নলকূপের গায়ের সেই লাল রং মুছে যায়। নতুন করে চিহ্নিত না করায় ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপগুলো আবারও মানুষের ব্যবহারে চলে আসে। ধুনটের মথুরাপুর গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের গ্রামের যেসব টিউবওয়েলে লাল রং দিয়েছিল, তা অনেক আগেই মুছে গেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা জানে না কোন টিউবওয়েলে লাল দাগ ছিল। আমরাও অনেকটা ভুলে গেছি। বিকল্প পানির ব্যবস্থা না থাকায় ওইসব নলকূপের পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।’ শুধু পুরোনো জরিপের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে শিবগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে আর্সেনিক ঝুঁকিপ্রবণ পাঁচটি ইউনিয়নে আবারও নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়। বাংলাদেশ এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ ওই জরিপ পরিচালনা করে। দেউলী ইউনিয়নের ৩১টি, সৈয়দপুরের ৪৩টি, মোকামতলার ৩০টি এবং ময়দানহাট্টা ও শিবগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামসহ মোট ২০ হাজার নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়।

জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থাটির গবেষণা সহকারী রিপন আহসান এ বিষয়ে বলেন, পরীক্ষিত নলকূপের ৬৯ শতাংশ বা ১৩ হাজার ৮০০টিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন দূষিত পানি পান করায় ওই পাঁচ ইউনিয়নে ৪০ জন আর্সেনিকোসিস রোগীকেও শনাক্ত করা হয়েছিল। যেসব নলকূপে আর্সেনিক পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো পরবর্তী সময়ে পুনরায় পরীক্ষা বা চিহ্নিত করা হয়েছিল কিনা এবং আক্রান্ত ৪০ জনের চিকিৎসা বা পুনর্বাসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে বিপন হাসান বলেন, তাদের কাজ শুধু পানি পরীক্ষা করে আর্সেনিক শনাক্ত করা। শনাক্তের পর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তারা পুনঃপরীক্ষা ও বিকল্প পানির ব্যবস্থা না করায় সমস্যাটি রয়ে গেছে।’

শিবগঞ্জের দেউলী এলাকার আবুল কালাম ও মরিয়ম বেগম আর্সেনিক আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন। তারা জানান, হাত-পায়ের নখে ফোসকার মতো দাগ এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়ায় ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হলেও নিরাপদ পানির বিকল্প না থাকায় আবারও একই নলকূপের পানি পান করতে হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে রুরাল সার্ভিস সেন্টার (আরএসসি) জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহায়তায় জেলার চারটি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫০০টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে। এর মধ্যে গাবতলীতে ৩০ হাজার নলকূপের মধ্যে ১ হাজার ১৮৯টিতে, শিবগঞ্জে ৩০ হাজারের মধ্যে ৯১৮টিতে, সারিয়াকান্দিতে ৩২ হাজার ৫০০টির মধ্যে ৬৯৩টিতে এবং ধুনটে ২৫ হাজারের মধ্যে ২৪৬টিতে আর্সেনিক পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে চার উপজেলায় ৩ হাজার ৫৫টি নলকূপে আর্সেনিক শনাক্ত হয়। তবে জেলার বাকি আট উপজেলায় কোনো জরিপ হয়নি। এমনকি ওই চার উপজেলাতেও বিপুলসংখ্যক নলকূপ পরীক্ষা না করে জরিপ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কোনো নলকূপ পরীক্ষা করা হয়নি।