রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে গত ৮ সেপ্টেম্বর ‘মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা: গুণগত মান ও টেকসই উন্নয়নে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। সমকাল ও ‘জননী’ প্রকল্প যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে
জননী প্রকল্প (স্ট্রেন্থেনিং দ্য মেটারনাল অ্যান্ড নিওনেটাল হেলথ সিস্টেম ইন রংপুর, বাংলাদেশ) রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায় মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কোইকার অর্থায়নে, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত নির্দেশনায় এবং সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে আরডিআরএস বাংলাদেশ এবং গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সহযোগী হিসেবে রয়েছে আইসিডিডিআর,বি। ২০২৩ সালের ১ মার্চ শুরু হওয়া প্রকল্পটি প্রথম পর্যায়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। বর্তমানে রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার ১৩টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ের কাজ চলছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিদ্যমান নবজাতক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে মা ও নবজাতক মৃত্যুর হার কমাতে সহায়তা করা; বিশেষ করে দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সেবা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা নারী ও পরিবারের মধ্যে নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা এবং নবজাতকের যত্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হচ্ছে। কমিউনিটি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করে সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ নিশ্চিত করাও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। দীর্ঘ মেয়াদে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে মা ও নবজাতকের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ গড়ে তোলা এই উদ্যোগের মূল প্রত্যাশা। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের জটিলতার ক্ষেত্রে দ্রুত উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে স্থানান্তর এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের সহযোগী হিসেবেও কাজ করছে জননী প্রকল্প।
ডা. সৈয়দ কামরুল ইসলাম পরিচালক, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সমন্বিত থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে সেবা পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু আমরা এখনও দেখছি, গ্রামাঞ্চলের নারীরা জরুরি প্রসূতিসেবার জন্য সরাসরি মেডিকেল কলেজ বা টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালে যাচ্ছেন। এতে টারশিয়ারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, রোগীদের খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে অফিস কর্মঘণ্টার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সীমিত উপস্থিতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জননী প্রকল্পের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মডেলে সরকারি-বেসরকারি ‘স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং’-এর মাধ্যমে অফিস সময়ের পরও গাইনি বিশেষজ্ঞ ও অ্যানেস্থেটিস্ট নার্সসহ সমন্বিত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসাযোগ্য। অফিস কর্মঘণ্টার পরও এ মডেলে জরুরি সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ‘হাব’ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে প্রাথমিক সেবাদান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা এবং জননী প্রকল্পের পরিকল্পনার সঙ্গে কিন্তু সামঞ্জস্য আছে। জননী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, এখানে নতুন কর্মী যুক্ত হলে আরও ভালো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
ডা. মো. নুরুল ইসলাম পরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
জননী প্রকল্প শেষ হলেও এর সুফল ধরে রাখাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। জননী প্রকল্প ৪০টি ইউনিয়নে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করে রেফারেল হার ২০ শতাংশের নিচে রাখতে পেরেছে এটি বড় সাফল্য। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আঞ্চলিক চাহিদা অনুযায়ী ‘স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং’ এবং বার্ষিক প্রকিউরমেন্ট পরিকল্পনা জরুরি। প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত সিজারিয়ান সেকশন কমানো সম্ভব। প্রতিটি উপজেলা ও জেলার সমস্যা এক নয়। কোনো উপজেলা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এগিয়ে থাকলেও পাশের কোনো উপজেলা দুর্গম এলাকা হওয়ায় পিছিয়ে থাকতে পারে। তাই কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। দেশের সব উপজেলার জন্য একই ধরনের উপকরণ কেনার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করা উচিত। একটি কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব করাতে গেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, কী কী উপকরণ প্রয়োজন তা আগে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস, ওষুধ, অক্সিজেনসহ অন্যান্য উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।