২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পর সারাবিশ্বের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন। তাঁর কথায়– যুক্তরাষ্ট্রকে তার বাণিজ্য-সহযোগীরা বাণিজ্যের মাধ্যমে শোষণ করে চলেছে। বিশেষত চীন মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা নিয়ে মার্কিন বাজার প্রায় পুরোপুরি দখল করে ফেলেছে। এ অবস্থা বদলানোর জন্যই নাকি এবারের শুল্কযুদ্ধ।

আসল কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি ক্ষীয়মাণ পরাশক্তি হওয়ার চক্রে প্রবেশ করেছে। আগামী সাত বছরের মধ্যে চীন তাদের ডিঙিয়ে বিশ্বের ‘এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি’তে পরিণত হবে। এই বাস্তবতা ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানরা মেনে নিতে চান না। তাই ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ স্লোগান দিয়ে তারা সারাবিশ্ব, বিশেষত চীনের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কিংবদন্তিসম সাবেক চেয়ারম্যান পল ভলকার ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে এক সাক্ষাৎকারে এবং তাঁর স্মৃতিকথামূলক বইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্লুটোক্রেসি বা ধনকুবেরতন্ত্র বলে ঘোষণা করেছিলেন। এই নতুন অভিধাটি আরও পাকাপোক্ত হয়েছে বিশ্বখ্যাত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগৎলিজও বিশ্বের প্রথম সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে প্লুটোক্রেসি অভিহিত করায়। ইতিহাস বিবেচনা করলে, কার্যত আশির দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের এ প্লুটোক্রেসিতে রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যখন মুক্তবাজার অর্থনীতি নাম নিয়ে সেখানে কট্টর দক্ষিণপন্থি পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৪৫ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট মারা যাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় অনেক ‘কম বৈষম্যপূর্ণ’ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এখন দেশটি এ সূচকে অন্য সব উন্নত-শিল্পায়িত ওইসিডি সদস্য দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। ৪৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার নিম্নতর আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষ তাদের প্রকৃত আয় স্থবির থেকে ক্রমশ নিম্নগামী হয়ে যেতে দেখেছে। অথচ দেশের ১০ শতাংশ ধনকুবেরের আয় ও সম্পদ বেড়েই চলেছে। ওই আশির দশক থেকেই সে দেশে ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদ বৈষম্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও ভোটের রাজনীতিতেও অর্থবিত্ত প্রধান ফলদায়ক উপাদানে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নআয়ের ৫০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের মাত্র ২.৫ শতাংশের মালিক হতে পেরেছে। এর পরের ৪০ শতাংশের দখলে রয়েছে জাতীয় আয়ের ৩০ শতাংশ। এর মানে, জনগণের ৯০ শতাংশের দখলে রয়েছে জাতীয় আয়ের মাত্র ৩২.৫ শতাংশ। আর ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীর দখলে চলে গেছে জাতীয় আয়ের ৬৭.৫ শতাংশ। অন্য কোনো উন্নত শিল্পায়িত দেশে আয় ও সম্পদবৈষম্য এত গুরুতরভাবে বাড়েনি।

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, জাপান, কানাডার মতো জি৭ দেশগুলোতে যে রকম পুঁজিবাদ প্রচলিত, তার তুলনায় মার্কিন পুঁজিবাদ অনেক বেশি কট্টর-দক্ষিণপন্থি ও বাজার-মৌলবাদী। মার্কিন স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি মুনাফাবাজ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর করায়ত্তে। মার্কিন শিক্ষাব্যবস্থাও ক্রমে বাজারীকরণের শিকার। মার্কিন ‘ফুডস্টাম্প’ কর্মসূচিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমে সংকুচিত করে চলেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সমাজের ধনাঢ্য জনগোষ্ঠীকে আরেক দফা করহ্রাসের সুবিধা দিয়ে আইন পাস করা হয়েছে ২০১৭ সালের মতো। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেহেতু শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বিপুল জনসমর্থনে ২০২৪ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, তাই নিম্নআয়ের অশ্বেতাঙ্গ ও লাতিনো জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর বিদ্বেষ তিনি কখনও লুকানোর চেষ্টা করেন না। অনেকেরই হয়তো জানা নেই, পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) বা ক্রয়ক্ষমতা সাম্য নীতির ভিত্তিতে চীনের জিডিপি মার্কিন জিডিপিকে ২০১৪ সালেই ছাড়িয়ে গেছে বলে ঘোষণা করেছিল আইএমএফ। সম্প্রতি দুই দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় নিয়ে আইএমএফ বলেছে, ২০৩১ কিংবা ৩২ সালে চীনের নমিনাল (বিদ্যমান বাজারদরের ভিত্তিতে নির্ধারিত) জিডিপি মার্কিন নমিনাল জিডিপিকেও অতিক্রম করে যাবে। এর মানে, ২০৩২ সাল নাগাদ নমিনাল জিডিপি এবং ক্রয়ক্ষমতার সাম্যের উভয় নিক্তিতেই বিশ্বের ‘এক নম্বর অর্থনীতি’তে পরিণত হবে চীন। বিশ্ব অর্থনীতির এই আসন্ন অবশ্যম্ভাবী পালাবদলকে নস্যাৎ করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মরিয়া হয়ে শুল্কযুদ্ধে নেমেছেন।

চীনের শাসকরা নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে ‘চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করে। এই ব্যবস্থায় অর্থনীতির প্রায় ৫০ শতাংশ বেসরকারি মালিকানায় রেখে বাকি ৫০ শতাংশের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা বহাল রাখা হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য যা প্রয়োজন মনে করে তা-ই করতে পারে। রাষ্ট্রীয় খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ মুনাফা আহরণকে একমাত্র লক্ষ্য মনে না করে রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কিন্তু উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখে রাষ্ট্রের একক শাসক দল চায়নিজ কমিউনিস্ট পার্টি। সেখানে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের মধ্যে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়তে না দেওয়া। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা যাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারে কিংবা আয় ও সম্পদ পুঞ্জীভবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব না দেয়, সেটাও কঠোরভাবে নজরদারি করে কমিউনিস্ট পার্টি। এ ধরনের শাসনব্যবস্থাকে ‘হাইব্রিড সোশ্যালিজম’ হিসেবে অভিহিত করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ১৯৭৬ সালে মাও সে তু-এর মৃত্যুর পর ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াও পিং-এর নেতৃত্বে এই সংস্কার পদ্ধতির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় গত ৪৮ বছরে চীন অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করতে সমর্থ হয়েছে। এই সময়ে চীন নিজেদের দেশের ৮০ কোটিরও বেশি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যা বিশ্বে একটি অবিশ্বাস্য ও অতুলনীয় সাফল্য হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। ২০২৫ সালেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা করেছেন– চীনে এখন ১ শতাংশেরও কম মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে।

লক্ষণীয়, চীনের শাসকরা মাও সে তুং-এর অনেক ভুল সত্ত্বেও তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দিতে কার্পণ্য করে না। কারণ মাও-এর নেতৃত্বেই ১৯৪৯ সালে সফল বিপ্লবের মাধ্যমে পিপলস রিপাবলিক অব চায়না প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচনী গণতন্ত্র, জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই বলে প্রচারণা আছে। কিন্তু প্রতিবছর প্রায় ১৩ কোটি চীনা নাগরিক বিদেশ ভ্রমণে যায় এবং দেশেও ফেরত আসে। বিশ্বাসযোগ্য জনমত জরিপে এটাও প্রমাণিত– প্রায় ৯৩ শতাংশ চীনা নাগরিক তাদের সরকারের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট। প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে চীন। ১৮৩৯ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ‘এ সেঞ্চুরি অব হিউমিলিয়েশন’ চীনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদ, যেখান থেকে ১৯৪৯ সালের বিপ্লব চীনকে মুক্তি দিয়েছে। চীন দৃঢ়পদে এগিয়ে চলেছে ‘বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি’ হওয়ার দিকে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কি পারবে চীনের এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে? ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়