বাঞ্ছারামপুরের বাড়িয়াদহ বিলে আড়াআড়িভাবে বাঁশ ও জাল দিয়ে তৈরি বাঁধ সমকাল
বাঞ্ছারামপুরের বাড়িয়াদহ বিলে আড়াআড়িভাবে বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে বিলের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ছোট মাছের অবাধ চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাছ চাষ করায় দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার হুমকিতে পড়েছে। শুধু মাছের প্রজনন নয়, বাঁশ ও জালের এই প্রতিবন্ধকতার কারণে বিলের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নৌ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নৌপথে পণ্য পরিবহনে বাধার মুখে পড়ায় অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিকল্প পথে পণ্য আনা-নেওয়া করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি, ২০০৯-এর শর্ত উপেক্ষা করে ইজারাদার ফরদাবাদ-রুপসদী ধীবর সমবায় সমিতির সদস্যরা ফরদাবাদ গ্রামের বাড়িয়াদহ বিলের বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি বাঁশ ও জাল স্থাপন করেছেন। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। অথচ জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ইজারা নেওয়া জলমহালের কোথাও প্রবাহমান প্রাকৃতিক পানি আটকে রাখা যাবে না। নীতিমালার মূল উদ্দেশ্যের মধ্যেও মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা উল্লেখ আছে। পাশাপাশি ইজারার শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালন হচ্ছে কিনা, তা জেলা ও উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটিকে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। শর্ত ভঙ্গ বা অনিয়ম পাওয়া গেলে ইজারা বাতিলের ব্যবস্থার কথাও নীতিমালায় বলা আছে। সরেজমিন দেখা যায়, বাড়িয়াদহ বিলের দক্ষিণ পাশের বাজারের পূর্বপাশের অংশে ও দক্ষিণ পাড়ায় বাঁশ ও জাল দিয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকের কারণে এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছোট মাছসহ জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করছেন স্থানীয় জেলেরা। তাদের ভাষ্য, বর্ষা ও প্রজনন মৌসুমে মাছের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিস্তারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয়রা বলেন, এক সময় এই বিলের বিভিন্ন অংশ দিয়ে অবাধে নৌকা চলাচল করত। বিলের সঙ্গে সংযুক্ত এলাকার মানুষ কৃষিপণ্য, মাছসহ বিভিন্ন মালপত্র নৌকায় করে আনা-নেওয়া করতেন। বর্তমানে বাঁশ ও জালের প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক স্থানে নৌকা চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের বিকল্প পথে অতিরিক্ত খরচ করে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, বিলটি ইজারা দেওয়ার পর মাছ চাষের নামে এমনভাবে বাঁশ ও জাল স্থাপন করা হয়েছে, যেন বিলের বিভিন্ন অংশ কার্যত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এতে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ কমে গেছে। একই সঙ্গে দেশীয় মাছের স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে বাড়িয়াদহ বিলের অভয়াশ্রম থেকেও কতিপয় লোকজন প্রতিবছর মাছ ধরে বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অভয়াশ্রমে মাছ ধরার সুযোগ না থাকার কথা থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে সেখানে মাছ ধরা হচ্ছে। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও করেছেন তারা। একই সঙ্গে বিলের স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত এবং দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলে, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। রূপসদী দক্ষিণ বাজারের ব্যবসায়ী কামরুল মিয়া জানান, বিলের বাঁধের কারণে ছয়-সাত বছর ধরে নৌকা দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে পারছেন না তিনি। বাধ্য হয়ে ট্রাকে মালপত্র আনতে হয়। এতে খরচ বেড়ে গেছে। বাঁধ অপসারণ হলে সারাবছর নৌকায় মালপত্র পরিবহন করা যাবে। এতে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করেও ভালো লাভ হতো। ফরদাবাদ গ্রামের কৃষক কাউসার আহমেদ বলেন, ‘বিলে বাঁধ থাকার কারণে কচুরিপানা আটকে যায় জমিতে। এগুলো অপসারণ করতে প্রতিবছর আমার অনেক টাকা খরচ হয়। আমরা বিভিন্ন সময় ইউএনওকে বলেছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’