রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের প্রহারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আহত হইবার ঘটনায় রবিবার রাজশাহী রেলস্টেশনে যেই ব্যাপক ভাঙচুর চলিয়াছে, তাহা কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নহে। শিক্ষার্থীদের বরাত দিয়া মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর বিনা টিকিটে ভ্রমণকে কেন্দ্র করিয়া রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী স্টেশনে দায়িত্বরত রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সহিত উক্ত দুই শিক্ষার্থীসহ তিন শিক্ষার্থীর বচসা হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের প্রহার করিলে তৃতীয় শিক্ষার্থী আহত হন। তৎপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত নিরাপত্তাকর্মীদের এক ঘণ্টার মধ্যে আটকের দাবি জানাইয়া সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন সালাউদ্দিন আম্মার। নির্দিষ্ট সময়ে উক্ত দাবি পূরণ না হওয়ায় রাত্র ১১টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন এলাকায় অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা এবং রাত্র সাড়ে ১১টায় শিক্ষার্থীদের একাংশ রাজশাহী রেলস্টেশনে গিয়া মূল ভবনের টিকিট কাউন্টার, ডাস্টবিন, জানালার কাচ, পার্সেল অফিস ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয় ভাঙচুর করে।

বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ যদ্রূপ অপরাধ, তদ্রূপ আইনানুযায়ী উক্ত অপরাধের প্রতিকার চেষ্টার পরিবর্তে অভিযুক্তকে প্রহার করাও ফৌজদারি অপরাধ। তবে দ্বিতীয় অপরাধের ঘটনায় আইনানুগ প্রতিকারের জন্য অপেক্ষা না করিয়া শিক্ষার্থীরা যেইভাবে আইন স্বহস্তে তুলিয়া লইয়াছেন, তাহা আরও বৃহৎ প্রকার অপরাধের জন্ম দিয়াছে। এই ক্ষেত্রে বিশেষত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের দায় অধিক বলিয়া আমরা মনে করি। শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরূপে তাঁহার নিকট যেইখানে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল; যাহার ফলে শুধু কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদই রক্ষা পাইত না; আইনের শাসনের অনন্য দৃষ্টান্তও স্থাপিত হইতে পারিত, সেইখানে তিনি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের উস্কানি দিয়াছেন। শুধু উহাই নহে, এই ন্যক্কারজনক ভূমিকার জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ না করিয়া তিনি বরং সহস্রাধিক মামলা হইলেও এহেন ধ্বংসাত্মক কর্ম চালাইয়া যাইবার ঘোষণা দিয়াছেন। অবশ্য আইন ও নিয়মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ কিংবা আইন ভঙ্গের ঘটনা সালাউদ্দিন আম্মার ইহাই প্রথম ঘটান নাই। বস্তুত নির্বাচিত হইবার পূর্বাপর সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বহু মব সহিংসতা পরিচালনা করিয়াছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক পর্যন্ত তাঁহার দ্বারা হেনস্তার শিকার হইয়াছেন। অন্যদিকে এই সকল অপকর্ম অনেকাংশে ফৌজদারি অপরাধতুল্য হইলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তো বটেই, সরকারও নীরব থাকিয়াছে।

শিক্ষার্থীকে মারধর, রেলস্টেশনে ভাঙচুরসহ সার্বিক বিষয় তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করিয়াছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আমাদের প্রত্যাশা, তদন্তে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হইবে এবং যাহারাই দোষী সাব্যস্ত হইবেন, তাহারাই আইনানুগ শাস্তির আওতায় আসিবেন। তবে ইহা সত্য, ইতোপূর্বে সংঘটিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ এবং উহার ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীদের উপর হামলা, প্রহার ও হেনস্তার ঘটনার পর গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অদ্যাবধি আলোর মুখ দর্শন করে নাই। এই কারণে একদিকে যদ্রূপ শিক্ষার্থীদের বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণের ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে, তদ্রূপ বেআইনিভাবে তাহাদের উপর হামলাকারীদের বিচার না হওয়ায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা জন্ম লইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও উচিত স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনায় আম্মার ও অন্য শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিরূপণ করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত নিবৃত্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শিক্ষার্থী হেনস্তায় রবিবার রাত্রিতেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য চতুষ্টয়কে সাময়িক বরখাস্ত করিয়াছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আমাদের প্রত্যাশা, ইহার মাধ্যমে শিক্ষার্থী হেনস্তার সমাপ্তি হইবে, তৎসহিত শিক্ষার্থীরাও সংযম প্রদর্শন করিবেন।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]