রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রবন্ধসাক্ষাৎকারঅনুবাদবই আলোচনানথিপত্রআর্কাইভ প্রবন্ধইমরান কামাল ‘পানিপথ’-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ০৩ সারকথা

কোনো দেশে জাতীয় চৈতন্য বাস্তব জমিনে পা রাখার আগে আগুয়ান সমাজ ও সেই সমাজের বিদ্বৎজনের কল্পনায় তা আসে। সেই কল্পনা আকার পেতে থাকে জাতীয় ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। কল্পনা প্রতীকায়িত হয় এবং ক্রমে তা সামূহিক চৈতন্যের অংশ হয়ে যায়। এমনকি জাতীয় ভাব বাস্তব চেহারা নেওয়ার পরও কিন্তু কল্পনার এই অভিযাত্রা থেমে থাকে না। ইতিহাসে দেখা যায়, জাতীয় ভাব ও কল্পনার নেতৃত্ব থাকে আগুয়ান শ্রেণির হাতে। আর সেই শ্রেণির মধ্যে যে জাতীয় ভাব ও কল্পনা গড়ে ওঠে, তার সংকট ও সম্ভাবনার আয়না হয়ে ওঠে সেই শ্রেণির সাহিত্য। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস ও কায়কোবাদের মহাশ্মশান-এর পর্যালোচনায় ইমরান কামাল ভারতবর্ষের অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ধরনের কল্পনার রূপরেখা দেখতে পেয়েছেন। ঐতিহাসিক পানিপথের যুদ্ধ নিয়ে দুটি সাহিত্যকর্মের তুলনার চমৎকার প্রয়াস ‘“পানিপথ-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা’প্রবন্ধটি।

ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮১৭—১৮৯৪) ও কাজেম আল কোরায়শীর (বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে যিনি কায়কোবাদ নামে সুপরিচিত, ১৮৫৭—১৯৫১) সাহিত্যজগতের মধ্যে তুলনা-বিচার চলে না। একজন ভারতের ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম যুগের সমাজচিন্তক ও দার্শনিক, অন্যজন উনিশ শতকের শেষ পর্বের সমাদৃত কবি। দুজনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বনামধন্য। তারপরও দুই ভুবনের এই দুই বাসিন্দাকে এক শিরোনামে বন্দী করা কেন? কারণ, তাঁরা দেশভাগ-পূর্ব বাংলা সাহিত্যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ওপর রচিত দুটি অসামান্য সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে ভূদেব রচনা করেন স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৩০২ বঙ্গাব্দ, ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ)। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কায়কোবাদের হাতে সৃজিত হয় মহাশ্মশান (১৯০৪)। দুই গ্রন্থেই তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ চিত্রিত হয় ভারতের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে। একই সঙ্গে উভয় রচনার বয়ান ও বর্ণনায় ভারতবর্ষের জাতীয়তার কল্পনা এবং জাতীয় ভাব প্রসঙ্গ হিসেবে জোরালোভাবে উপস্থিত। স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তার (ভূদেবের দৃষ্টিতে ‘হিন্দু জাতীয়তা’) পরাজয় এবং ‘স্বাধীন ভারত’ নামের স্বপ্নের শেষ সম্ভাবনার মৃত্যু হিসেবে হাজির হয়। মহাশ্মশান-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ হয় ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের বীরত্বের গৌরবময় কীর্তিগাথা (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫১)।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, দুটি রচনাই তাঁদের স্বস্ব সময়খণ্ডের (কোনো ক্ষেত্রে পরের কালেও) বিদ্বৎসমাজে হয় উপেক্ষিত, না হয় তীব্র কটাক্ষের শিকার। ভূদেবের স্বপ্নকল্পনার অখণ্ড ভারত তাঁর সমসাময়িক বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফিকশনাল ও অলীক রাষ্ট্রকল্পনার বিরাট নির্মিতির নিচে চাপা পড়ে। আর কায়কোবাদের জাতীয় গৌরবের আখ্যান তৎকালীন বাংলার (বিশেষ করে) মুসলমান সমাজে সৃষ্টি করে বিপ্রতীপ প্রতিক্রিয়া। এই কাব্যের বিরুদ্ধে আনা হয় ‘নীতিহীনতা’র ভীষণ অভিযোগ (শামসুদ্দীন ১৯৯৪)। তৎকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজে একভাবে উপেক্ষিত মহাশ্মশান পরবর্তী সময়ে মুনীর চৌধুরীর (রক্তাক্ত প্রান্তর, ১৯৬২) হাতে নবজীবন পায় বটে। কিন্তু সাবভার্শনে (sub version) যুদ্ধবিরোধী চেতনা আর সেক্যুলার ভাবের ভিড়ে তার পুরোনো মহিমা ঢাকা পড়ে যায়। সমকালীন উপেক্ষা আর তির্যক আক্রমণের পরও ভূদেবের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের ‘ভারত’ কল্পনায় এবং উপনিবেশবাদবিরোধী ভাবাদর্শিক শিবিরে চিন্তার রসদ জুগিয়ে গেছে। আবার অন্যদিকে মহাশ্মশান-এর তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের চোরাস্রোতের মতো মুনীর চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী মৃধাদের (পাতকী পানিপথ, ১৯৮৪) সাহিত্যিক নির্মিতির মধ্য দিয়ে বলা যায়, বদলে গিয়ে জীবিত থেকেছে।

তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে এ দুই গ্রন্থনাকে পাশাপাশি রেখে পড়ার উদ্দেশ্য, বাঙালি উচ্চবর্গ ও বাংলার অগ্রণী শ্রেণির সংস্কৃতিতে ‘জাতীয় ভাব’ ও ‘জাতীয় পরিচয়’কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অলীক কল্পনার তত্ত্ব-তালাশ এবং জাতীয় ভাব ঘিরে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠা উচ্চবর্গের চিন্তাসংকটের ওপর মোটাদাগের অনুসন্ধান চালানো।

ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস সাহিত্যের প্রচলিত ধরনের ছাঁচে ফেলে পাঠ করা মুশকিল। আবার এ লেখায় সাহিত্যকল্পনার এত প্রশ্রয় আছে যে একে সাহিত্য-আঙিনার বাইরে রাখাও কঠিন। অন্যদিকে ইতিহাস হিসেবে এই রচনার এক রকম পাঠ দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আগাগোড়া বয়ানধর্ম ইতিহাসের উল্টোরথে ঘোরে, তাই একে ইতিহাস হিসেবে না পড়ে কল্পিত ইতিহাসরূপে পাঠ করাই শ্রেয় মনে হয়। ভূদেব নিজেও অবশ্য তা-ই চেয়েছেন; অর্থাৎ পাঠক তাঁর এই রচনা একটি অলীক (utopic) কল্পনা হিসেবে পাঠ করুন। এমন এক স্বপ্ন পাঠকের মনে ঈপ্সিত হোক, যা ভবিষ্যতের কোনো এক পর্বে ‘পুনরুত্থান’-এর আশা রূপে ভারতবর্ষে (না হলে অন্তত বাংলায়) প্রকট হবে।