রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রবন্ধসাক্ষাৎকারঅনুবাদবই আলোচনানথিপত্রআর্কাইভ প্রবন্ধমাহা মির্জা বাংলাদেশে উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনাপ্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ১৬ সারকথা
অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত কারা, সেটা চিহ্নিত করা গেলে তাদের অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও অবদানের সুযোগগুলোও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফল ও কারণ হিসেবে নতুন এক উঠতি মধ্যবিত্তকেও দেখা যাচ্ছে। উন্নয়ন গবেষক মহা মির্জা প্রশ্ন করছেন, শ্রমিকের আয় না বাড়লে উঠতি মধ্যবিত্তেরও বিকাশ থমকে যায় কিনা। রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়াভাবে ভর না করে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় চাহিদানির্ভর শিল্পায়নের গুরুত্ব কতটা। স্থানীয় শিল্পায়নভিত্তিক কর্মসংস্থান ছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হবে কীভাবে? বাংলাদেশের উন্নয়নের নীতির গুরুতর একটা ফাঁক হলো এই নীতির মধ্যে শ্রমিক ও নিম্নমধ্যবিত্তের অস্তিত্বটা প্রায়ই ভুলে থাকা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটা অর্থনীতির সার্বিক বিকাশকেই ভারসাম্যহীন করে ফেলে। অর্থনীতির তত্ত্বের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান ও সর্বজনের স্বার্থ মেলানো অর্থনৈতিক আলোচনা যেখানে বিরল, সেখানে মহা মির্জার প্রবন্ধটি বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গেই আলোচনা করেছে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংজ্ঞা কী? ঠিক কাকে মধ্যবিত্ত বলে? খুব স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা স্থান, কাল বা একাডেমিক ডিসিপ্লিন অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। যেমন সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যবিত্তের সংজ্ঞায়ন এবং অর্থনীতিবিদদের সংজ্ঞায়ন এক নয়। আবার ঔপনিবেশিক সময়ের মধ্যবিত্ত এবং এখনকার 'শহুরে' নাগরিক মধ্যবিত্ত এক নয়। যেমন 'সামন্তীয়' ইউরোপে মধ্যবিত্ত বলতে বোঝানো হতো পেজেন্ট্রি (কৃষক) ও নোবেলিটির (অভিজাত) মাঝখানে গড়ে ওঠা শ্রেণিটি। আবার পশ্চিমের এখনকার সমাজবিজ্ঞানীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উচ্চশিক্ষা এবং ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির মানদণ্ডে চিহ্নিত করেছেন, যাঁরা মূলত টেবিলে বসে চাকরি করেন এবং দৈহিক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত নন। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ হোমি খারাস মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে : Being in the middle class implies having a comfortable standard of living, economic security, and self-reliance. The middle classes come from a range of occupations : government officials, college graduates, rich farmers, traders, business people, and professionals. They are in various management and clerical jobs. Many are self-employed in small businesses, crafts, and on commercialized family farms (খারাস ২০১১ : ৫৯) ।
বলা বাহুল্য, অর্থনীতিবিদেরা মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেন আয় ও ব্যয়ের নিক্তিতে। যেমন ব্যানার্জি এবং ডাফলো (২০০৮) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় (এক্সপেন্ডিচার) ৬ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে ধরে। বার্ডসল (২০০৭) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু আয় ১০ ডলারের ওপরে ধরে। রাভালিওন (২০০৯) পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্ত (ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্তকে (ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) আলাদা আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে চিহ্নিত করেছেন। আবার হোমি খারাস (২০১০) ‘গ্লোবাল মিডল ক্লাস’র হিসাব দেখিয়েছেন মাথাপিছু ব্যয় ১০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে (এডিবি ২০১০ : ৫ ।) তাঁর মতে, এই পরিসীমার মধ্যবিত্তের মধ্যে নতুন ধরনের পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা তৈরি হয়। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ (বিশ্বব্যাংকে কর্মরত) এজাজ ঘানি অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : A bigger middle class spends more, leading to higher business profits, savings and investment, higher growth and a larger middle class (খারাস ২০১১ : ৭৫)। তবে সব মধ্যবিত্তের মাপকাঠি এক নয়। মধ্যবিত্তের মধ্যে আছে উচ্চমধ্যবিত্ত আবার নিম্নমধ্যবিত্তও। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে মধ্যবিত্তের এই ভাগগুলোর সংজ্ঞায়নও আবার এক নয়।
মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে নানা রকমের হিসাব দেখা গেলেও এটি আসলেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো অর্থনৈতিক চরিত্র হলো তার বাড়ন্ত ক্রয়ক্ষমতা। মধ্যবিত্ত কেবল খাদ্যবস্ত্র, বাসস্থানে খরচ করে না, বরং ‘এসেনশিয়াল’ বা আবশ্যক পণ্যগুলোর বাইরেও ‘নন-এসেনশিয়াল’ কিন্তু ডিজায়ারেবল (কাঙ্ক্ষিত) পণ্যগুলোতে খরচ করা শুরু করে। মধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, মধ্যবিত্ত ঘর সাজানোর জিনিস কেনে, মধ্যবিত্ত প্লাস্টিকের সস্তা আসবাবের পরিবর্তে কাঠের মজবুত আসবাব কেনে। মধ্যবিত্ত কার্পেট কেনে, বালিশের কুশন কেনে, বছরে একবার কক্সবাজার বা সিলেটে বেড়াতে যায়। লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মধ্যবিত্ত আইপিএস কেনে। তাই একটি দেশের মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই হচ্ছে সামগ্রিকভাবে ওই দেশের বাজার ও অর্থনীতির চরিত্র ও ধরন বদলে যাওয়া, বাজারের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহে পরিবর্তন ঘটা।
মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত ও ভিয়েতনামে এবং তার কিছু পরে বাংলাদেশের মতো এককালীন দরিদ্র দেশগুলোতেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। মূলত গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সন্তানদের শহরে পড়তে আসা, পড়ালেখা শেষে শহরেই চাকরির খোঁজ করা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর শহরে থেকে যাওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের শহরের দিকে টানা ইত্যাদি নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে, এমনটাই আমরা দেখি। ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ২০০৭ সালেই দেখিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। ম্যাকেন্জি রিপোর্টের মতে, এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির কনজাম্পশন বা ভোগের প্রবণতায় নাটকীয় পরিবর্তন আসবে, ‘These groups choose what they will consume, rather than be driven by the necessities of life. Such discretionary choices, reflecting the tastes of the new Indian middle class, will dominate consumption patterns.’ (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। যেমন, নব্বইয়ের দশকে ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু কনজ্যুমার গুড বা ভোগ্যপণ্যের চাহিদা হুহু করে বাড়তে থাকে। এই বাড়তি চাহিদার পণ্যের তালিকায় আছে গাড়ি, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং রেফ্রিজারেটর। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় মধ্যবিত্ত সম্পর্কে মন্তব্য করেছে এভাবে : They enjoy a lifestyle that most of the world would recognize as middle class and typically own a television, a refrigerator, a mobile phone and perhaps even a scooter or a car. Although their budgets are stretched, they scrimp and save for their children's education and their own retirement (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭)।