রাজশাহী থেকে নাটোর ও পাবনা হয়ে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতে দূরত্বের ধকল অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে পুঠিয়া-চারঘাট-বাঘা-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়ক। ৫৫৪ কোটি টাকা খরচে নির্মিত ৫৪ কিলোমিটার এই সড়কের সাড়ে ৫২ কিলোমিটারের কাজ তিন বছর আগে শেষ হয়েছে। ভূমি নিয়ে জটিলতার কারণে আটকে আছে চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদরের মাত্র দেড় কিলোমিটার ভাঙাচোরা সড়কে। এ কারণে দূরপাল্লার গণপরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক এবং স্থানীয় হাজার হাজার মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।

৫০০ মিটারজুড়ে বড় বড় গর্ত ও ইটের স্তূপ সরেজমিনে চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদরে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন অংশ খুঁড়ে রাখা হয়েছে। বাঘা অংশে প্রায় এক হাজার মিটার এবং চারঘাট অংশে প্রায় ৫০০ মিটারজুড়ে বড় বড় গর্ত, মাটি ও ইটের স্তূপ। বর্ষায় গর্তে পানি জমে হাঁটুসমান কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলার আস্তরণে ঢাকা পড়ে পুরো এলাকা। একটি অটোরিকশার যে পথ পার হতে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট লাগার কথা, যানজট আর খানাখন্দের কারণে সেখানে লেগে যাচ্ছে ২০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। ধীরগতির কারণে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট, ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা। দুর্ভোগ এড়াতে খুলনা থেকে রাজশাহীগামী অনেক ট্রাককে বাড়তি প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। খুলনা থেকে রূপপুর-রাজশাহী রুটে চলাচলকারী ট্রাকচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেড় কিলোমিটারের কারণে ৫০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে ট্রিপের সময় এলোমেলো হয়ে যায়। গাড়ির যন্ত্রাংশ তো নষ্ট হচ্ছেই, মাঝেমধ্যে যানজটে মেজাজ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।’

ভূমিজটে থমকে যাচ্ছে কাজ ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিন দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। সাড়ে ৫২ কিলোমিটারের কাজ শেষ হলেও চারঘাট ও বাঘা বাজারের দেড় কিলোমিটার অংশটি ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আটকে যায়। একাধিকবার দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার বদল করা হলেও কাজের গতি ফেরেনি। ২০২৫ সালের মার্চে আরসিসি ঢালাই ও ড্রেন নির্মাণের জন্য ২২ কোটি টাকার চুক্তি হলেও জমি খালি না থাকায় ঠিকাদার কাজ শুরু করতে পারেননি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় ১৯ কোটি টাকার নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাজের গতি এখনও শ্লথ। সড়কের দুপাশে দোকানপাট ভেঙে ফেলা হলেও ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়ায় নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না অনেকে। চারঘাট বাজার এলাকার জমির মালিক জিল্লুর রহমান জানান, জমি ও ব্যবসা হারিয়ে তারা দিশেহারা। বাঘার ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ছয় বছর ধরে ব্যবসা প্রায় বন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে দোকানের সামনে পানি জমে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চারঘাট উপজেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম এ পরিস্থিতিকে পুরো অঞ্চলের জন্য ‘বিষফোঁড়া’ বলে অভিহিত করেছেন। চারঘাট বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাজশাহী বিমানবন্দর এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক। বারবার আশ্বাস নয়, এবার সত্যি সত্যি এই বিষফোঁড়ার অপসারণ দেখতে চান চারঘাট ও বাঘাবাসী।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, প্রতি জেলা সভাতে তারা এই দেড় কিলোমিটারের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরছেন, কিন্তু আশ্বাসের বাস্তবায়ন মিলছে না। রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ আকন্দ জানিয়েছেন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সমস্যাটি দীর্ঘায়িত হয়েছে। নতুন ঠিকাদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে দেড় কিলোমিটার সড়ক, ড্রেন ও আলোকায়নের কাজ শেষ হবে। ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. আরিফ হোসেন জানান, আইনি ও কাগজপত্রের জটিলতার কারণে কিছু মানুষের ক্ষতিপূরণ বিলম্বিত হলেও সওজকে আনুষ্ঠানিকভাবে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]