নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাসে নারায়ণগঞ্জ ব্যতিক্রমী ভূখণ্ড। এই জেলার বুক চিরে প্রবাহিত ছোট-বড় অনেক নদী। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা গুরুত্বপূর্ণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নদ-নদী বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, যোগাযোগ ও নগরায়ণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এক সময় শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ জল, ব্রহ্মপুত্রের প্রাণবন্ত স্রোত এবং মেঘনার অফুরন্ত জীববৈচিত্র্য এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু আজ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীর পানি অনেক স্থানে কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত এবং জীববৈচিত্র্যহীন। মাছ কমেছে, তীর দখল হয়েছে, নাব্য হারিয়েছে অনেক অংশ।

নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল। এখানে অসংখ্য বস্ত্রকল, ডাইং, ওয়াশিং, নিটিং, কাগজ, রাসায়নিক, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ-ভাঙা, খাদ্য এবং বিভিন্ন উৎপাদন শিল্প গড়ে উঠেছে। এগুলো দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে; লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে। কিন্তু শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কারখানা কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার ব্যবহার করে না কিংবা নিয়মিতভাবে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলে, তারা শুধু আইন লঙ্ঘন করছে না; পরিবেশ ধ্বংস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদও নষ্ট করছে। নদীদূষণের আরেকটি বড় উৎস আমাদের নগরজীবন ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সমকালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে– ‘নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আবাসিক ও বাজার এলাকার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে আশপাশের অন্তত পাঁচটি নদী ও খালে। কোথাও কোথাও মহাসড়কের পাশে এমনকি নিচু জমিতেও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে’ (২৯ আগস্ট ২০২৬)।

বস্তুত প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ শহর ও অন্যান্য উপজেলার জনবসতি থেকে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজারের আবর্জনা, নির্মাণ বর্জ্য এবং অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সরাসরি নদীতে কিংবা নদীমুখী খাল-নালায় ফেলা হচ্ছে। একবার এসব বর্জ্য নালায় পড়লে শেষ পর্যন্ত সেগুলো শীতলক্ষ্যা, মেঘনা বা ব্রহ্মপুত্রের পানিতেই গিয়ে মিশছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে জমে থাকা আবর্জনা, প্লাস্টিক ও নোংরা বর্জ্য একযোগে নদীতে নেমে আসে। ফলে নদীর পানি দূষিত; জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস; পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত এবং নদীর তলদেশে দূষিত পলির স্তর জমতে থাকে।

প্রশ্ন হলো, নাগরিক জীবন থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে, তার দায় কার? নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, উপজেলার বিভিন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ কি প্রতিটি পরিবার ও বাজারের জন্য কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পেরেছে? সব এলাকায় কি নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা হয়? যেখানে এই সেবা পৌঁছায় না, সেখানে মানুষ বাধ্য হয়ে খাল, ডোবা কিংবা নদীর তীরকে বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে না তো?

পরিকল্পিত ল্যান্ডফিল, বর্জ্য পৃথক্‌করণ, পুনর্ব্যবহার কিংবা জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর অবকাঠামো কতটা গড়ে উঠেছে– সেসব প্রশ্নেরও সন্তোষজনক উত্তর আমরা পাই না।

নাগরিক সচেতনতার ঘাটতিকেও উপেক্ষা করা যায় না। অনেকে নিজের বাড়ি বা দোকান পরিষ্কার রাখলেও তাদেরই উৎপাদিত বর্জ্য নদী, খাল বা ড্রেনে ফেলে দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করেন। প্লাস্টিক, পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্ট, জবাই করা পশুর বর্জ্য জলাশয়ে ফেলার প্রবণতা এখনও উদ্বেগজনক। ফলে নদীদূষণের জন্য শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; নাগরিক আচরণ ও দায়িত্ববোধের সংকটও সমানভাবে দায়ী। নদীকে আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই দীর্ঘ মেয়াদে সফল হবে না। একইভাবে নদী দখলে শুধু বড় প্রভাবশালীরা নয়; ছোট ছোট অবৈধ স্থাপনা, অস্থায়ী দোকান, ঘাট, বসতি, মাটি ভরাট ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার মতো কর্মকাণ্ডও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে। তাই কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, কঠোর নজরদারি, নদী দখলমুক্তকরণ; সর্বোপরি নাগরিক পরিবেশ সচেতনতা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে না পারলে প্রতিদিনের মানবসৃষ্ট বর্জ্য ও দখলদারিত্বই আমাদের নদীগুলোকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।