শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো কিংবা অন্য কোনো ধরনের ব্যায়ামের বিকল্প নেই। কিন্তু শহরের ব্যস্ত রাস্তায় শরীরচর্চা করতে গেলে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়—বায়ুদূষণ। ব্যায়ামের সময় শরীরের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করে। সেই বাতাস দূষিত হলে ক্ষতিকর কণাও বেশি পরিমাণে শরীরে ঢোকার সুযোগ পায়। বিশেষ করে যানজটপূর্ণ সড়ক, ব্যস্ত মোড় কিংবা বেশি দূষিত এলাকায় নিয়মিত ব্যায়াম করলে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
সম্প্রতি সকালে দৌড়ানোর সময় রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক নিয়মিত দৌড়বিদ। এ সময় একটি ভ্যান তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির ঘন ধোঁয়া তাঁর চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে যায়। লন্ডনে বসবাসকারী ওই নিয়মিত সাইকেল চালক ও দৌড়বিদের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। যাতায়াতের পথেই সাইকেল চালানো বা দৌড়ানোর কারণে ট্রাফিক সিগন্যালের সামনে প্রায়ই যানবাহনের পেছনে আটকে থাকতে হয়।
এমন অভিজ্ঞতা থেকেই প্রশ্ন ওঠে—দূষিত রাস্তায় ব্যায়াম করা কি শরীরের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করছে? গবেষকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যায়ামের উপকারিতাই বেশি। তবে কোথায়, কখন এবং কীভাবে ব্যায়াম করা হচ্ছে, তার ওপর দূষণের ঝুঁকি অনেকটাই নির্ভর করে। ব্যায়াম বন্ধ না করে কিছু সহজ উপায়ে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ কমানো যেতে পারে।
বায়ুদূষণের সঙ্গে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষ দূষিত বাতাসে শ্বাস নেয়। এর কারণে প্রতিবছর ৬৭ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে।ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক অড্রে ডি নাজেল বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। বায়ুদূষণ শরীরের প্রায় সব অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। আগে মনে করা হতো, দূষিত বাতাস মূলত শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে। তবে এর সঙ্গে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবেরও সম্পর্ক রয়েছে।
বায়ুদূষণের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো পিএম ২.৫। এগুলো এতই সূক্ষ্ম যে মানুষের চুলের পুরুত্বের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ ছোট। যানবাহনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এসব কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহে মিশে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতে পারে। সময়ের সঙ্গে শরীরে এসব কণা জমা হলে মস্তিষ্কেও প্রভাব পড়তে পারে। ২০২৫ সালে ৫১টি গবেষণার ওপর করা একটি পর্যালোচনায় প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে তিন ধরনের বায়ুদূষণ এবং পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি বাড়ার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি ছিল পিএম ২.৫। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ ও ওই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক হানিন খ্রিইস বলেন, কণাগুলো খুব ছোট হওয়ায় রক্ত-মস্তিষ্কের প্রতিবন্ধক ভেদ করে মস্তিষ্কেও প্রবেশ করতে পারে। এতে শুধু রক্তনালি ও ওই প্রতিবন্ধকের ক্ষতিই হয় না, শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কেও এসব কণা পৌঁছাতে পারে।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় শরীরচর্চার সময় নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো দূষকও শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় এর সঙ্গে পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের বিকাশ ও কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়। বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া, কার্বন মনোক্সাইড ও ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা ওজোনও থাকতে পারে। শহরের ভূগর্ভস্থ পরিবহন ব্যবস্থাতেও সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বেশি হতে পারে। এর একটি বড় অংশ চাকা, রেললাইন ও ব্রেকের ঘর্ষণ থেকে তৈরি ধাতুসমৃদ্ধ ধূলিকণা।