মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি দূর পরবাসটাস্কানির পথে-গ্যালিলিও থেকে মাইকেলাঞ্জেলোলেখা: রাশিদুল হক, আমেরিকাপ্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৫০ সময়টা ২০০৮ সাল। এক ভ্রমণদিনে স্ত্রী শিরিন চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে এসে পৌঁছেছিলাম ইতালির টাস্কানিতে—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, মধ্যযুগের ইতিহাস, রেনেসাঁর শিল্প আর আধুনিক বিজ্ঞানের উন্মেষ যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি পথ হেঁটেছে। কিছু জায়গার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় সেখানে পা রাখারও অনেক আগে। বইয়ের পাতায়, ছবির ফ্রেমে, কিংবা কারও বলা গল্পে একটু একটু করে তার একটি মানচিত্র আঁকা হয়ে যায় মনের ভেতর। তাই সেখানে পৌঁছে মনে হয় না, প্রথমবার এলাম; বরং মনে হয়, বহুদিনের চেনা কোনো জায়গায় ফিরে এলাম। টাস্কানি আমার কাছে ছিল তেমনই এক ফিরে পাওয়া ভূখণ্ড।

সেই কল্পনার প্রথম দৃশ্যটি ছিল পিসা। দূর থেকে চোখে পড়েছিল পৃথিবীর বিস্ময়কর স্থাপত্যগুলোর অন্যতম হেলে পড়া শ্বেতমর্মর মিনার—সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চিরাচরিত নিয়মকে যেন অগ্রাহ্য করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একদিকে নত হয়ে আছে। তার পাশে ক্যাথেড্রাল ও ব্যাপ্টিস্ট্রি, আর শহরের বুক দিয়ে নীরবে বয়ে চলেছে আরনো নদী। এই পিসার সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন গ্যালিলিও-মানুষের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করে প্রকৃতির কাছে উত্তর খোঁজার এক অসাধারণ প্রতীক।

কিন্তু টাস্কানির গল্প পিসাতেই শেষ হয় না। সেই আরনোই আরও উজানে ছুঁয়ে গেছে ফ্লোরেন্সকে-রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান জন্মভূমি। সেখানে ব্রুনেলেস্কির ‘ডুওমো ক্যাথেড্রাল’ আকাশ ছুঁয়েছে, মাইকেলাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ পাথরের মধ্যে মানুষকে নতুন মর্যাদায় দাঁড় করিয়েছে, আর ‘উফিজি’ গ্যালারির দেয়ালে আজও বেঁচে আছে রেনেসাঁর রং ও কল্পনা। এই দুই শহরের বাইরে ছড়িয়ে আছে টাস্কানির ঢেউতোলা পাহাড়, আঙুরখেত, জলপাইবাগান, সাইপ্রেসের সারি আর পোড়ামাটির ছাদের ছোট ছোট জনপদ। সেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সৃষ্টি যেন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—একই ছবির দুটি অংশ।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেদিনের ভ্রমণ শুধু দুটি শহর দেখা ছিল না। পিসায় আমরা দেখেছিলাম মানুষের প্রশ্ন করার সাহস, ফ্লোরেন্সে তার সৃষ্টিশীলতার দীপ্তি, আর টাস্কানির পথে-প্রকৃতি ও সভ্যতার এক অপূর্ব সহাবস্থান।

টাস্কানির কথা বলতে গেলে ফ্লোরেন্সের কাছে এসে যেন একটু থামতেই হয়। আরনো নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর শুধু টাস্কানির রাজধানী নয়—ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান জন্মভূমি। চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য ও মানবতাবাদী চিন্তার যে নবজাগরণ ইউরোপের মননকে বদলে দিয়েছিল, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠেছিল এই ফ্লোরেন্সেই।

শহরের আকাশরেখায় প্রথমেই চোখ টেনে নেয় ‘সান্তা মারিয়া দেল ফিওরে’ (Santa Maria del Fiore)-ফ্লোরেন্সের বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল—যাকে সবাই সহজভাবে ‘ডুওমো’ (Duomo) বলে। সবুজ, গোলাপি ও সাদা মার্বেলের বিশাল স্থাপত্যের মাথায় নির্মিত সেই অসাধারণ লালচে গম্বুজ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এত বিশাল গম্বুজ কীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল, সেটিই একসময় ছিল প্রকৌশলের বিরাট চ্যালেঞ্জ। আজও দূর থেকে ডুওমোর দিকে তাকালে মনে হয়, ফ্লোরেন্স যেন তার সমস্ত ইতিহাস একটি গম্বুজের নিচে ধরে রেখেছে।