চীনের উত্থান বুঝতে হলে শুধু এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়– দেশটি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ‘প্রতিস্থাপিত’ করতে চায় কিনা। কারণ তা চীনের পরিবর্তনশীল বিশ্বভূমিকাকে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে। আসল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, চীন ঠিক কেমন আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে। আর তা অর্জনে প্রতিষ্ঠান, চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা– এসব বিষয়কে একসঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করছে।

চীনের কৌশল কোনো একক মতবাদ বা নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হয় না। বরং এটি একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত কাঠামো হিসেবে বিকশিত হচ্ছে। এর আদর্শিক মূলে রয়েছে ‘মানবজাতির জন্য এক অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ার ধারণা। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং ২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ। চীন এই উদ্যোগগুলোকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা ও বৈশ্বিক শাসনের পরিপূরক মাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ যোগাযোগ স্থাপনের মূল ব্যবহারিক মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এর মানে এই নয়, চীন একটি সম্পূর্ণ চীন-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। বরং মনে হচ্ছে, চীন একটি বিশেষ কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে উপযোগী সেখানে বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরে থেকে কাজ করা; যেখানে সম্ভব সংস্কার সাধন; প্রয়োজন অনুযায়ী পরিপূরক কাঠামো তৈরি এবং যেসব ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থা চীনের স্বার্থ রক্ষায় অপর্যাপ্ত, সেখানে নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বোঝা নেপালের মতো একটি ছোট দেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চীন বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং জি২০-এর মতো সংস্থাগুলোতে সক্রিয়। এর পাশাপাশি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো নতুন বা পরিপূরক কাঠামোতেও এর ভূমিকা বেড়েছে।

এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিক্ষা পাওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিবর্তন করতে হলে তাকে ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিষ্ঠানের ভেতরের প্রভাবের ভারসাম্য পরিবর্তন করেও ফল বদলে দেওয়া যায়। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি চীন নতুন বা পরিপূরক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হয়তো পশ্চিমাদের প্রতিস্থাপনকারী কোনো একক চীনা ব্যবস্থা হবে না। বরং এটি হবে একটি বহুমুখী ও আন্তঃসংযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। শুধু প্রতিষ্ঠান দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না; চিন্তাভাবনা বা ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই ‘মানবজাতির জন্য এক অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’-এর ধারণাটি এত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে সূচিত এই ধারণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের সম্পৃক্ততার মূল আদর্শিক ভিত্তি হয়ে উঠছে।

এর অর্থ এই নয়, প্রতিটি চীনা প্রকল্প একেকটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। তবে অবকাঠামো-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব নিশ্চিতভাবে রয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি শুধু এটা নয় যে রাস্তা, রেলপথ, বন্দর বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা কে তৈরি করছে? আসল প্রশ্ন হলো, এগুলো কোনো দেশকে কোন বৃহত্তর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করছে? ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কেবল ভূখণ্ড, সামরিক শক্তি বা জিডিপি দিয়ে নির্ধারিত হবে না। প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের ভূমিকা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিযোগাযোগ, কৃত্রিম উপগ্রহ, ডিজিটাল লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডেটা সিস্টেম নতুন ধরনের কৌশলগত শক্তি তৈরি করছে। যে দেশ প্রযুক্তি তৈরি করে, সে তা বিক্রি করতে পারে। কিন্তু যে দেশ অন্য দেশের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার গভীরে নিজের প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, মানদণ্ড, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো গেঁথে দিতে পারে, সে আরও স্থায়ী প্রভাব তৈরি করে। একে বলা যায় ইকোসিস্টেম পাওয়ার বা বাস্তুতন্ত্রগত ক্ষমতা।