চট্টগ্রাম জেলায় ২০টি এলাকাকে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলায় এ বছর আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৭০০ জনের মতো। এর মধ্যে দুই হাজার ২৪০ জন এসব এলাকার বাসিন্দা। এ পর্যন্ত প্রাণ হারানো ১৮ জনের মধ্যে ১২ জন এসব এলাকার।
জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্য ১৪ উপজেলার তুলনায় বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে এখানে। চিহ্নিত হওয়া বাকি ১৯টি এলাকার মধ্যে রয়েছে– নগরীর হালিশহর, কোতোয়ালি, বন্দর, পাহাড়তলী, বায়েজিদ, আকবরশাহ, বাকলিয়া, সদরঘাট, খুলশী, চান্দগাঁও, ডবলমুরিং, পাচলাইশ ও পতেঙ্গা। কর্ণফুলী, বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, আনোয়ারা ও পটিয়া উপজেলাও আছে এই তালিকায়। এসব এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে দিনে বাড়ছে মশার উপদ্রব। তবে ওষুধ ছিটাতে দেখা যায়না।
সীতাকুণ্ডে সর্বশেষ গত সোমবার কোরবান আলী রিফাত নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার কাজলীপাড়া গ্রামের মো. ইউনুসের ছেলে। এ নিয়ে গত ১০ দিনে এই উপজেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা গেছেন।
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকাক বাসিন্দা ছিলেন ২৯ বছর বয়সী রাশেদা বেগম রিমি। তাঁর শরীরে গত ৩ সেপ্টেম্বর তীব্র জ্বর দেখা দেয়। রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজেটিভ শনাক্ত হয়। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করার পর ৯ সেপ্টেম্বর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। দ্রুত কমতে থাকে তাঁর প্লাটিলেট। ১০ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। সম্প্রতি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে হালিশহরের আই ব্লকের বাসিন্দা চার বছরের মুনতাহা। তার বাবা আকমল হোসেন বলেন, ‘কিছুদিন ধরে এলাকায় প্রতিদিন কেউ না কেউ আক্রান্ত হচ্ছে। এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার হলে আমার মেয়ের এ অবস্থা হতো না।’ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর ২৬ বছর বয়সী অর্পিতা দাশের মৃত্যু হয়। তিনি হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত নগরের কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা আশরাফ আলী রোডের বাসিন্দা ছিলেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর ময়না আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। তিনি আরেক হটস্পট বন্দর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রাণ যাওয়া অনুশ্রী দাশও নগরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বর নাজমা শিরিন আঁখি নামে এক গৃহিণীর মৃত্যু হয়। তিনি হালিশহরের নয়াবাজার বিশ্বরোড এলাকার বাসিন্দা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় বেশ কিছু এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছি আমরা। মশার বিস্তার ঠেকাতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’ সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় ক্রাশ প্রোগ্রামও শুরু হয়েছে। তবে জনগণ সচেতন না হলে শুধু সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা বন্ধ করতে হবে। পরিত্যক্ত সামগ্রীতে পানি জমে থাকলে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।’ চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘প্রতিদিন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বাড়ছে। চাপ সামাল দিতে ডাক্তার, নার্সসহ সবাইকে নানা চ্যালেঞ্জে পড়তে হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২১ আগস্ট এক দিনেই সর্বোচ্চ ১২৬ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১১০। চলতি মাসের প্রথম ২২ দিনে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৬৪৭ জন, প্রাণ গেছে ১৩ জনের। লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন জুয়েল বলেন, তিন মাসেও কাউকে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেননি। বন্দরের সল্টগোলা এলাকার বাসিন্দা শিমলা হক বলেন, তাঁর সাত বছরের মেয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এলাকায় পরিচিত আরও কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছে।
ই-মেইল: [email protected], [email protected]