চারিদিক আলোর রশ্মি। গ্যালারিতে মুহুর্মুহু আওয়াজ। মিজুহো স্পোর্টস পার্ক আঙিনায় অ্যাথলেটিকসের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট দেখতে দর্শকদের ভিড়। ফ্লাডলাইটের আলোতে হওয়া এই আয়োজনে বাংলাদেশের স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমানও ছিলেন। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ভেসে ওঠা তাঁর ছবিতে লন্ডন প্রবাসী এ ক্রীড়াবিদকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের গতির লড়াইয়ে ইমরানুর পারেননি নিজের ক্যারিয়ার সেরা টাইমিং করতে। তবে হিটের চেয়ে সেমিফাইনালে টাইমিংয়ে উন্নতি হয়েছে তাঁর। গতকাল এশিয়ান গেমসে ছেলেদের ১০০ মিটার দৌড় শেষ করতে ইমরানুরের লেগেছে ১০ দশমিক ৪৪ সেকেন্ড। নিজের হিটে আট প্রতিযোগীর মধ্যে বাংলাদেশের এ দ্রুততম মানব হয়েছেন সপ্তম। সব মিলিয়ে ২৪ প্রতিযোগীর মধ্যে হয়েছেন ২১তম। গত বৃহস্পতিবার হিটে ইমরানুর দৌড় শেষ করতে সময় নিয়েছিলেন ১০ দশমিক ৪৯ সেকেন্ড।
গতকাল শুক্রবার টাইমিংয়ে উন্নতি হয়েছে। ইমরানুর যদি নিজের ক্যারিয়ার সেরা ১০.১১ করতে পারতেন, তাহলে ফাইনালেই উঠতে পারতেন। শেষ চারে তৃতীয় হওয়া ওমানের আল বালুশি দৌড় শেষ করতে সময় নিয়েছেন ১০ দশমিক ১৩। ইমরানুর নিজেও জানেন সেরাটা মেলে ধরতে পারলে ফাইনালে যেতে পারতেন। ‘আমি বলতে চাচ্ছি, নিজের সেরা টাইমিংটা করতে পারলে অবশ্যই ফাইনালে যেতে পারতাম। কিন্তু সবাই তো আর প্রতিবার ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং করতে পারে না। আমাকে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার দিকে দেখতে হবে, আর আজ আমার সেই ধারাবাহিকতা ছিল না। প্যারিসের পর দুই বছর ইনজুরিতে থেকে ফিরে এটাই আমার প্রথম বছর। তাই আমাকে ইতিবাচক দিকটাই দেখতে হবে। অন্তত আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়নি। তবে আরও ভালো টাইমিং করার চেষ্টা করা উচিত ছিল। আর যা-ই হোক, সামনের টুর্নামেন্টগুলোর জন্য আমাকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। বছরের সবচেয়ে বাজে রেস ছিল এটা, নানা কারণে। তবে এমনটা হয়, আর যা-ই হোক না কেন, আমাকে এখান থেকে সামনে এগোতে হবে। আর কী-ই বা বলব... হ্যাঁ, আমি সত্যিই হতাশ।’
ইমরান যখন ট্র্যাকে নামেন, তখন শুরুটা করেন দুর্দান্ত। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমান তালে লড়াই করেন, সেটা ৬০ মিটার পর্যন্ত। বাকি ৪০ মিটার পার হতে গিয়ে ইমরানের দৌড়ের গতি কমে যায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ইনডোরের ৬০ মিটারে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, মাঠের ১০০ মিটারে ততটা নয়। এই বিষয়টি নজরে আনলে ইমরানের জবাব ছিল এমন, ‘সত্যি বলতে, এ বছরের এশিয়ান ইনডোর টুর্নামেন্টেও আমি সেমিফাইনালে উঠেছিলাম। আগের বছরগুলোতে আমি ফাইনালে উঠতাম বা চ্যাম্পিয়ন হতাম। এ বছরটা আমার জন্য ফিরে আসার বছর। এ বছরটাকে একটা শক্ত ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে আগামী বছর আরও ভালো করার কাজে লাগাতে চাই, ইনশাআল্লাহ।’
নিজের পারফরম্যান্সের মূল্যায়নের সময় এসেছে বলে মনে করেন তিনি, ‘টাইমিং কিছুটা ভালো ছিল, তবে খুব বেশি উদ্বেলিত বা আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু নয়। কোথায় ভুল হয়েছে তা দেখতে হবে, কোথায় উন্নতি করা যায় তা বুঝতে হবে, তারপর ইনশাআল্লাহ আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসব।’ যাদের সঙ্গে দৌড়েছেন তাদের তুলনায় নিজে কতটা পিছিয়ে সেটাও তুলে ধরেছেন ইমরানুর, ‘ওরা বলতে গেলে এশিয়ার সেরা। আমি সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছি, আর আজকের দিনে এটাই ছিল আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা। আজ আমি এর চেয়ে ভালো দিতে পারতাম না, তবে তা যথেষ্ট ছিল না– আমি আমার আসল মান বা দক্ষতা দেখাতে পারিনি। নিজের পারফরম্যান্সে খুব একটা সন্তুষ্ট নই। কারণ আমি যেমন পারফর্ম করতে চেয়েছিলাম, তা পারিনি। আমার মনে হয়, রেসের কিছু কিছু জায়গা আরও ভালো হতে পারত। তবে আমাকে একটু পিছিয়ে এসে পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে হবে, দেখতে হবে কোথায় আরও ভালো করা যেত এবং সেখান থেকে নিজেকে শুধরে নিয়ে এগোতে হবে।’
লন্ডনে নিজ উদ্যোগে ট্রেনিং করেন ইমরানুর রহমান। সঙ্গে চাকরিও করেন তিনি। আরও ভালো কিছু করার জন্য ইমরানুর তাকিয়ে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নবগঠিত কমিটির দিকে, ‘প্রথমত, আপনারা সবাই জানেন, আমি ফুলটাইম চাকরি করি। চাকরির পেছনে যেমন প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়, তেমনি অনুশীলনেও ব্যয় হয়। অনুশীলনের সময় আমার আরও কিছুটা নমনীয়তা দরকার। আমি জানি নতুন ফেডারেশন কিছু সহযোগিতামূলক বিষয় নিয়ে কাজ করবে। দেখা যাক, সামনে কী হয়, কারণ এই খেলায় আমার হয়তো আর দুই থেকে তিন বছর সময় আছে। আর এই সময়ের মধ্যে যদি কিছু না করতে পারি, তাহলে সার্বিক উন্নতি হবে না।’
আগামী দুই বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান, সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন ইমরানুর, ‘একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমি সব সময় নিজের খেলায় উন্নতি করতে চাই। আমি জানি এশিয়ান ইনডোরে আমি একটি স্বর্ণপদক পেয়েছিলাম। সত্যি বলতে, এশিয়ান পর্যায়ে বাংলাদেশের হয়ে পরবর্তী স্বর্ণপদক কবে আসবে, তা আমি নিশ্চিত নই। আমার জন্য ওটাই ছিল সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। তবে আমি আরও অনেক কিছু দিতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয়, সামনের এই দুটি বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এরপর আমি কতটা দিতে পারব, তা জানা নেই।’