লাকী ইনাম। নন্দিত অভিনেত্রী। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে মঞ্চায়ন হয়েছে তাঁর পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নাটক ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। চলতি মাসে ৭৫ বছরে পা রেখেছেন তিনি। নাটক ও অন্যান্য প্রসঙ্গে এই গুণী অভিনেত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এমদাদুল হক মিলটন।

বেশ বিরতির পর মঞ্চে নতুন প্রযোজনা ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’ নিয়ে এসেছেন। কেমন সাড়া পেলেন? বেশ সাড়া মিলেছে। সাধারণত বছরে একটি নাটক মঞ্চে আনার চেষ্টা করি। এবার একটু দেরি হয়ে গেল। তবুও আমরা হাল ছাড়িনি। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এখন অনেক দলই বেশি সংখ্যক অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে দলগত প্রযোজনা করতে হিমশিম খায়। এর মধ্যেও অভিনেতা-অভিনেত্রী, কোরিওগ্রাফার ও কলাকুশলী মিলিয়ে আমাদের প্রযোজনায় অংশ নিয়েছেন ৩৫ জন নাট্যকর্মী। সবাইকে নিয়ে প্রযোজনাটি মঞ্চায়নে নিয়ে আসতে পারাই বড় প্রাপ্তি।

ড. ইনামুল হকের অনুপস্থিতিতে তাঁর ভালোলাগার, ভালোবাসার থিয়েটারটি করে যেতে পারছি–এটা আমার কাছে গর্বের। শুক্রবার দেড় ঘণ্টার নাটকটি দর্শকশ্রোতা হলভর্তি হয়ে দেখবেন, এটাই প্রত্যাশা ছিল। প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তিরও যোগসূত্র হয়েছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রাণবন্ত অভিনয়, আসমা দেবযানীর গায়কী, বিশ্বজিৎ বাদলের সুরের খেলা, ঠাণ্ডু রায়হানের আলোর খেলা এবং সুমন আহমেদের কোরিওগ্রাফি দর্শকদের চমৎকার সময় উপহার দিয়েছে।

শুনেছি, আপনার জন্মদিনকে ঘিরে নাটকটি মঞ্চে এসেছে? ঠিকই শুনেছেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর ৭৫ বছরে পা রেখেছি। দলীয় কর্মীরা দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন করতে চেয়েছিলেন। আমি ভেবে দেখলাম, আশৈশবই তো শিল্প-সংস্কৃতি ও নাটকের সঙ্গে নিবেদিতভাবে আছি। তাই জন্মদিন উদযাপন যদি করতেই হয়, নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে হোক। ২৫ সেপ্টেম্বর শিল্পকলায় হল পাওয়ায় নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নতুন প্রযোজনা ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’র সৃজন ও প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে আমার শিল্পজীবনের উদযাপন হয়েছে।

‘দুই পাখি ও নন্দিনী’র প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যদি একটু বলতেন নাগরিক নাট্যাঙ্গন এ পর্যন্ত পথনাটক ও মঞ্চনাটক মিলিয়ে ২৭টি প্রযোজনা করেছে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য থেকে ড. ইনামুল হক ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ এবং আমি ‘মুক্তির উপায়’ করেছি। এবার তাঁর কবিতা ‘দুই পাখি’ ও ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীকে ঘিরে এই প্রযোজনা। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি শোষণ, শাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবন অনেকটাই রোবোটিক হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রাচুর্য, বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও পরাধীন জীবন; অন্যদিকে অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও কষ্টের মধ্যেও স্বাধীন জীবন। একটি যেন সোনার খাঁচার পাখি, অন্যটি মুক্ত বনের পাখি।

এই পরাধীনতা ও স্বাধীনতার দ্বন্দ্বের মধ্যে আসে ‘রক্তকরবী’র নন্দিনী–যিনি আত্মার মুক্তি এবং সব ধরনের খাঁচা ও ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার পথ দেখান। যক্ষপুরীর মকররাজের শোষণে কিশোর, ফাগুলালের মতো অসংখ্য মানুষ যখন রোবটের মতো জীবনযাপনে বাধ্য, তখন নন্দিনী দ্রোহ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাদের মানবিক অধিকার ও জীবন উদযাপনের পথে ফিরিয়ে আনতে চায়। স্বাধীনতা ও মুক্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই পাখির জিজ্ঞাসা এবং নন্দিনীর সমাধানের চিরন্তন ও সমসাময়িক শিল্পরূপই ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনার ক্ষেত্রে হৃদি হকের ভাবনা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আবহসংগীত, পোশাক ও দ্রব্যসামগ্রী–সব ক্ষেত্রে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নাট্যকর্মীরা সর্বোচ্চ বিশ্বাস, নির্ভরতা ও ভালোবাসা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।