ফ্রিডরিখ মার্জ জার্মানির চ্যান্সেলর পদে বসেছেন দেড় বছরেরও কম সময় হলো। এরই মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমেছে। তাঁর মধ্য ডানপন্থি দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন অব জার্মানি (সিডিইউ) সম্প্রতি একটি রাজ্য নির্বাচনে হেরেছে এবং অন্যটিতে শোচনীয়ভাবে ধসে পড়েছে। দলটি এখন দেশজুড়ে খাদের কিনারায়। জার্মান সংবাদমাধ্যম অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে বা লিখতে পারছে না। তারা মার্জকে দায়ী করছে দুর্বল প্রচারণার জন্য, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একটি অপ্রিয় জোটে নিজেকে আটকে ফেলার জন্য। তা ছাড়া উগ্র ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) যেভাবে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে, সেভাবে তাঁর দলটি ব্যর্থ হয়েছে। এসবই সত্য, তবে মূল সমস্যার তুলনায় এগুলো গৌণ।

জার্মানিতে তাদের প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে তাদের মুখোশ মাটিতে খুলে পড়ছে। আর সাধারণ মানুষ এখন দেখতে পাচ্ছে তারা আসলে সব সময় কী ছিল। মূলত অশুভ মতাদর্শের অন্ধ অনুসারী, যারা নির্মমভাবে এমন সব অন্ধ ও জনবিরোধী নীতি বাস্তবায়ন করে গেছে; যা জার্মান সমাজকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দিয়েছে এবং ইউরোপের মাটিকে একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে।

ধূসর স্যুটে মোড়ানো এবং মৃদুস্বরে কথা বলা এই ধর্মান্ধতা; যা ক্লান্তিহীনভাবে পুনরাবৃত্তি করে গেছে যে ‘বিকল্প কোনো পথ নেই’। এই প্রবণতা যতক্ষণ না বিশাল পরিসরে ব্যর্থ হতে শুরু করে ততক্ষণ ধর্মান্ধ বলে মনে হয় না। সম্প্রতি যা বদলে গেছে তা হলো ব্যালট বাক্সের প্রভাব। মধ্যপন্থিদের এই চরমপন্থার কারণে সৃষ্ট শিল্প খাতে উৎপাদনহীনতা ও স্থবিরতাকে এখন আর কোনোভাবে চেপে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এএফডি হঠাৎ করে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি যে লাখ লাখ জার্মান হঠাৎ এক ঐশ্বরিক আলো পেয়ে ফ্যাসিবাদী ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। বরং বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর অর্থনৈতিক সংকোচন নীতি জার্মানদের এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে তাদের মর্যাদা হারানোর ভয় এবং চরম দারিদ্র্যের উচ্চঝুঁকি রয়েছে। এতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে যে উগ্র ডানপন্থিরা একটি কাল্পনিক সোনালি অতীতে ফিরে যাওয়ার সুড়সুড়ি দিয়ে ভোটারদের মধ্যে একটি রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে–যে অতীতে ছিল না কোনো ‘সন্দেহভাজন’ আগন্তুক কেউ–সেটা মুসলিম, ইহুদি কিংবা ট্রান্সজেন্ডার কেউ?

বার্লিন থেকে প্যারিস কিংবা লন্ডন–সবখানে গল্পটা একই। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মধ্যপন্থা ফ্রান্সকে একাই ঠেলে দিয়েছে এক সুদূর ডানপন্থি নেতৃত্বের দিকে। তিনি ফ্রান্সের পুনর্জাগরণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব ছিল। কারণ তিনি জার্মানির সঙ্গে এমন এক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন, যার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি এই নয় যে ফ্যাসিবাদ আবার ইউনিফর্ম পরে মার্চ করে ফিরে আসছে। ট্র্যাজেডি হলো তথাকথিত বিবেচক মধ্যপন্থার রাজনৈতিক সংস্কৃতিটি একটি চরমপন্থি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মতো আচরণ করে চলেছে–অসহিষ্ণু, কট্টর এবং নিজেদের অপরিহার্যতা সম্পর্কে অন্ধভাবে নিশ্চিত। আর ভোটাররা যখন বৈধ কোনো বিকল্প না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সামনে থাকা একমাত্র অবৈধ পথটি বেছে নেন, তখন এই মধ্যপন্থিরা অবাক হওয়ার ভান করেন।

মার্জের জনপ্রিয়তার এই ধস তাঁর ব্যক্তিগত আকর্ষণ বা ক্যারিশমার অভাবের বিচার নয়। এটি আসলে সেই মধ্যপন্থার কাছে দিন শেষে আসা পাওনার হিসাব, যারা নিজেদের ধর্মান্ধতাকে উদারতা বলে ভুল করেছিল এবং তাদের সবাইকে ইউরোপের জন্য হুমকি বলে চিহ্নিত করেছিল।

ইয়ানিস বারুফাকিস: গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং অ্যাথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম