বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি দূর পরবাসআলো যখন মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রক: গল্পের শুরু একটি সবুজ শৈবাল থেকেলেখা: রাশিদুল হক, আমেরিকাপ্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫: ০৬ মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক স্নায়ুকোষ নিজেদের মধ্যে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদানের মাধ্যমে আমাদের চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ, ভয়, আনন্দ, সিদ্ধান্ত ও আচরণের জটিল জগৎ সৃষ্টি করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুবিজ্ঞানের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল—মস্তিষ্কের কোনো বিশেষ আচরণ, স্মৃতি বা অনুভূতির জন্য ঠিক কোন স্নায়ুকোষ বা স্নায়ুবর্তনী (স্নায়ুকোষের কার্যকর নেটওয়ার্ক) দায়ী, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা যাবে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ আমূল বদলে দিয়েছেন তিন বিজ্ঞানী—কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল। আলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং আলোক-জিনপ্রযুক্তি বা অপটোজেনেটিকস-সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁদের যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে ২০২৬ সালের শারীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার। এই আবিষ্কার এমন এক প্রযুক্তির জন্ম দিয়েছে, যার সাহায্যে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত চালু বা বন্ধ করা যায়। ফলে বিজ্ঞানীরা এখন শুধু মস্তিষ্কে কোথায় কী ঘটছে, তা পর্যবেক্ষণই করেন না, বরং একটি নির্দিষ্ট স্নায়ুবর্তনী সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে তার কাজও পরীক্ষা করতে পারেন। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
এই অসাধারণ আবিষ্কারের গল্প মানুষের মস্তিষ্ক থেকে শুরু হয়নি। এর সূচনা হয়েছিল একটি ক্ষুদ্র এককোষী সবুজ শৈবাল ক্ল্যামাইডোমোনাস থেকে। এই অণুজীব আলো শনাক্ত করতে পারে এবং আলোর উপস্থিতি অনুযায়ী সাঁতারের দিক পরিবর্তন করতে পারে। বিজ্ঞানীদের মনে তাই প্রশ্ন জেগেছিল—চোখ বা মস্তিষ্ক না থাকা সত্ত্বেও একটি এককোষী শৈবাল আলো শনাক্ত করে কীভাবে? পিটার হেগেমান দীর্ঘদিন ধরে ক্ল্যামাইডোমোনাসের আলোকসংবেদন নিয়ে গবেষণা করেন। পরবর্তী সময়ে গেয়র্গ নাগেল ও তাঁদের সহযোগীদের গবেষণায় এর পেছনে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আণবিক ব্যবস্থাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ‘চ্যানেলরোডপসিন’ নামের একধরনের আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন।
চ্যানেলরোডপসিন কোষঝিল্লিতে অবস্থানকারী আলোনিয়ন্ত্রিত একটি আয়ন চ্যানেল। নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পড়লে প্রোটিনটির গঠনে পরিবর্তন ঘটে এবং এর মধ্যকার ক্ষুদ্র পথটি খুলে যায়। তখন বিভিন্ন ধনাত্মক আয়ন কোষঝিল্লির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে। এর ফলে কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে চ্যানেলরোডপসিন-২ নীল আলোয় অত্যন্ত দ্রুত সক্রিয় হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যই পরবর্তী সময়ে স্নায়ুবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটায়। একটি ক্ষুদ্র শৈবালের সূর্যালোক শনাক্ত করার ব্যবস্থা যে একদিন মানুষের মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে, সেই সময়ে তা কল্পনা করাও কঠিন ছিল। প্রসঙ্গত, মানুষের কোষে চ্যানেলরোডপসিন-২ (ChR2)-এর কোনো সরাসরি সমতুল্য জিন বা প্রোটিন নেই। মানুষের মেলানোপসিন (OPN4) আলোকসংবেদী হলেও এটি নিজে আয়ন-চ্যানেল নয়; অন্যদিকে অণুজীবের ChR2 একই সঙ্গে আলো শনাক্ত করে এবং সরাসরি একটি আয়ন-চ্যানেল হিসেবে কাজ করে।
এরপর বিজ্ঞানীদের সামনে আরও সাহসী একটি প্রশ্ন এল—শৈবালের এই আলোনিয়ন্ত্রিত প্রোটিনটি যদি স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্নায়ুকোষে তৈরি করানো যায়, তাহলে কি আলো দিয়ে সেই স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? কার্ল ডাইসেরথ ও তাঁর সহযোগীরা এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন। চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরির নির্দেশ বহনকারী জিন স্নায়ুকোষের মধ্যে প্রবেশ করানো হলে স্নায়ুকোষের ঝিল্লিতে এই আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি হয়। এরপর নীল আলো ফেললে চ্যানেলরোডপসিনের পথ খুলে যায় এবং ধনাত্মক আয়ন স্নায়ুকোষের ভেতরে প্রবেশ করে। এর ফলে স্নায়ুকোষের ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভব পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তনটি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে সৃষ্টি হয় ক্রিয়াবিভব বা অ্যকশন পটেনশিয়াল। অর্থাৎ, স্নায়ুকোষটি সক্রিয় হয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে। ২০০৫ সালে ডাইসেরথ ও তাঁর সহযোগীরা দেখান, এই পদ্ধতিতে স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই প্রযুক্তিই পরবর্তী সময়ে পরিচিত হয় অপটোজেনেটিকস বা আলোক-জিনপ্রযুক্তি নামে।
অপটোজেনেটিকসে দুটি বিষয় একত্র হয়েছে—আলো ও জিনপ্রযুক্তি। সহজভাবে বলা যায়, জিনগত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করে তুলে পরে আলো দিয়ে সেই কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তিই অপটোজেনেটিকস। প্রথমে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিনের মতো আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন তৈরির জিন প্রবেশ করানো হয়। এরপর সেই স্নায়ুকোষে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পৌঁছে দেওয়া হয়। নীল আলো চ্যানেলরোডপসিন-২ সক্রিয় করলে স্নায়ুকোষ উত্তেজিত হয়। আবার অন্য ধরনের আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে আলো দিয়েই স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ কমানো বা বন্ধ করা সম্ভব। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীদের হাতে যেন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের একটি আলোক-সুইচ এসে গেল। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষকে লক্ষ্য করে কাজটি করা যায়।
আণবিক পর্যায়ে প্রক্রিয়াটি আরও চমকপ্রদ। চ্যানেলরোডপসিনের মধ্যে রেটিনাল নামের একটি আলো শোষণকারী অণু থাকে। নীল আলোর একটি আলোককণা রেটিনালে শোষিত হলে এর আণবিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের প্রভাবে চ্যানেলরোডপসিনের আয়ন চলাচলের পথ খুলে যায়। এরপর ঘটনাগুলো ঘটে ধারাবাহিকভাবে—নীল আলো, চ্যানেলরোডপসিন সক্রিয়, ধনাত্মক আয়ন কোষে প্রবেশ, কোষঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভবের পরিবর্তন ক্রিয়াবিভব সৃষ্টি, স্নায়ুসংকেত পরিবহন। ক্রিয়াবিভব স্নায়ুকোষের প্রান্তে পৌঁছালে ক্যালসিয়াম আয়ন প্রবেশের পথ খুলে যায়। ক্যালসিয়াম প্রবেশের ফলে ক্ষুদ্র থলি থেকে গ্লুটামেট বা অন্যান্য স্নায়ুসংকেতবাহী রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। এগুলো পরবর্তী স্নায়ুকোষের গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন সংকেত সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, একটি ক্ষুদ্র আলোককণা শেষ পর্যন্ত একটি স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হতে পারে।