রাজধানী ঢাকার চার স্থানে দুই দিনেরও কম সময়ে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, দখলচেষ্টা ও লুটপাটের যেই চিত্র সোমবার সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে, উহা জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিরাজমান গভীর সংকটের প্রতিফলন আখ্যা দিলে তাহা অত্যুক্তি হইবে না। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দুই শতাধিক দুর্বৃত্ত মিরপুরে প্রায় অর্ধশতাব্দী যাবৎ দরিদ্রদের স্বাস্থ্য ও টিকাকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়াইয়া দেয়। উক্ত ঘটনার মাত্র ৩৭ ঘণ্টা পর শনিবার সকালে টিকাকেন্দ্রটি হইতে মাত্র সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে ১৭ কাঠা জমি দখলের লক্ষ্যে সংঘটিত হয় সশস্ত্র হামলা-ভাঙচুর। একই দিন সকালে স্বল্প দূরত্বের আদাবর শ্যামলী হাউজিংয়ে ৮ তলা বাড়ি দখলের চেষ্টায় রামদা, চাপাতি, পিস্তলসহ প্রায় ২০ জনের একটি দল হামলা চালায়। আর শনিবারই প্রায় মধ্যরাত্রে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের পর আশপাশের কয়েকটি বাড়িসহ স্থাপনায়ও হামলা করা হয়। লোমহর্ষক এই ঘটনাগুলির কারণ ও হোতা ভিন্ন হইলেও প্রতিটিই ছিল দলবদ্ধ হামলা এবং হামলাকারী অনেকের হস্তে ছিল দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র।। উপরন্তু ঘটনাস্থল হইতে সংশ্লিষ্ট থানার দূরত্ব অধিক না হইলেও মোটামুটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী সংঘটিত প্রতিটি হামলার সময় পুলিশকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। প্রথম ঘটনায় তো খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই স্বীকার করিয়াছেন, পুলিশের গাফিলতি ছিল। বলা যায়, অপরাধীরা ‘শঙ্কাহীন চিত্তে’ এই সকল অপরাধ ঘটাইয়া নির্বিঘ্নে চম্পট দিয়াছে।

অধিকতর উদ্বেগের বিষয়, এইরূপ সংঘবদ্ধ জমি দখলচেষ্টা, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা কেবল রাজধানীতে নহে; দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়শ ঘটিয়া চলিয়াছে। প্রাণহানিও হইতেছে বিস্তর। তথাপি এইগুলি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে না। অবশ্য ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করিলে স্পষ্ট উপলব্ধ হয়, পরিকল্পিত এই সকল অপরাধকর্মের সহিত প্রধানত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সংশ্লিষ্ট; অন্তত আশীর্বাদপুষ্ট। যেইখানে সাধারণ অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হইতে পারিতেছে না, সেইখানে ক্ষমতাসীন দলভুক্ত সন্ত্রাসী ও দখলদারদের বিরুদ্ধে তাহাদের কঠোর হইবার আশা বাতুলতা মাত্র।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বৎসর এবং বর্তমান সরকারের সাত মাস অতিক্রান্তের পরও বিপর্যস্ত পুলিশ সম্পূর্ণ ঘুরিয়া দাঁড়াইতে সক্ষম হইয়াছে কিনা– উহাও গুরুতর প্রশ্ন। এই কারণে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত আইন কার্যকর লইয়া অনেক জায়গায় এখনও পুলিশের মধ্যে দ্বিধা ক্রিয়াশীল– অস্বীকারের উপায় নাই। রাজনীতিতে বিদ্যমান প্রকট বিভাজনের প্রভাব বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও মধ্যে থাকা বিস্ময়কর কিছু নহে। এহেন পরিস্থিতিতে বাহিনীগুলির মধ্যে বরাবর যেই সকল অসাধু সদস্যরা ছিলেন, তাহারা সক্রিয় হইবেন না। আর অপরাধীদের সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করিবেন না– এমন দাবিও করা যায় না। শুধু উহা নহে, পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিগণ যেইভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি কার্যত বিস্মৃত হইয়াছেন, উহা সম্ভবত অপরাধীদের আশকারা দিবার পাশাপাশি পুলিশকেও দায়িত্ব পালনে শিথিলতা প্রদর্শনের সাহস দিয়া চলিতেছে।

আমরা মনে করি, দলীয় দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ, তৎসহিত দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাইতে না পারিলে জননিরাপত্তার সংকট শুধু গভীরই হইবে না; ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামতের সকল প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে, যাহা বহুবিধ নূতন রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রকেও বিপন্নতার দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। তাই সরকারকে অস্বীকারের সংস্কৃতি হইতে বাহির হইয়া অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ লইতে হইবে।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]