দিনভর নিখোঁজ থাকার পর কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের লাশ পাওয়া যায়, যাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে। এরই মধ্যে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে– তাদের কোনো সদস্য এই মামলায় আসামিদের পক্ষে দাঁড়াবেন না। এ বিষয়ে আমরা প্রায় সবাই নীরব! এ ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। গত ২৯ আগস্ট রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতি একই ধরনের সংবাদ সম্মেলন করে জানায়– একটা জঘন্যতম অপরাধের আসামিদের পক্ষে তাদের কোনো সদস্য আদালতে দাঁড়াবেন না।
এই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনের অনুভূতি বোঝা কঠিন নয়। আইনজীবীরা মানুষ। তাদেরও অনুভূতি আছে। তারাও চান অপরাধের কঠিনতম শাস্তি হোক। একটা শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সেই অপরাধীর পক্ষে দাঁড়াতে না চাওয়া মানবিকভাবে একেবারেই বোধগম্য। প্রশ্নটা তাই এই ক্ষোভের বৈধতা নিয়ে না। প্রশ্নটা এই ক্ষোভ প্রকাশের ধরন নিয়ে। একজন আইনজীবী ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন– তিনি নৈতিক জায়গা থেকে এই আসামির পক্ষে লড়বেন না। এমনকি এই সিদ্ধান্ত যদি অনেক আইনজীবীর মধ্যে একটা সাধারণ, অনানুষ্ঠানিক ঐকমত্যেও পরিণত হয়, সেটাও এক ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে থেকে যায়। কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠান, একটা বার অ্যাসোসিয়েশন যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়– তাদের কোনো সদস্য একজন নির্দিষ্ট আসামির পক্ষে দাঁড়াবেন না, তখন সেটা আর ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ থাকে না। সেটা প্রতিষ্ঠানিকভাবে একটা মানুষকে আইনি প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
আমরা জানি, অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতর হোক, প্রত্যেক মানুষের আইনজীবী পাওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। এটা কোনো বিমূর্ত নীতিকথা নয়; ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটা দেশে, যেখানে একজন ব্যক্তিকে মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়; পরে দেখা যায়, সে আসলে ততটা দোষীও না। এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষার অধিকার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কামরুন নাহার মনির ঘটনাতেও আমরা ঠিক একই ধরন দেখেছি। জনরোষ, রাজনৈতিক চাপ, আর দ্রুত রায়ের প্রত্যাশার মধ্যে পড়ে একজন নির্দোষ মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানোর মতো আইনজীবী খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো, তাঁর নিজের অবস্থান আদালতে তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে যেত। কুমিল্লা, রংপুর, ঢাকা– তিনটা আলাদা ঘটনা, আলাদা সময়ে, কিন্তু একই কাঠামোতে ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে একটা জঘন্য অপরাধের পর জেলা বা কেন্দ্রীয় আইনজীবী সমিতি সাংগঠনিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে– তাদের সদস্যরা আসামির পক্ষে দাঁড়াবেন না। এই পুনরাবৃত্তিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এটা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে জনরোষের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নৈতিক অবস্থান প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়াকেই সবচেয়ে সহজ পথ মনে করছে। তা ছাড়া এতে ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর তার প্রকৃত প্রভাব কী হতে পারে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই অপরাধের গুরুত্বকে খাটো করা নয়। একজন আইনজীবী নিজ বিবেচনায় কোনো মামলা নিতে অস্বীকার করতেই পারেন। এটা তাঁর অধিকার। কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠান সেই সিদ্ধান্তকে আনুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত করলে সেটা সুন্দর দেখায় না। আর যে কোনো ব্যক্তির স্বাধীনভাবে অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়ানোর সুযোগও কার্যত সংকুচিত হয়ে যায়। আমরা সবাই চাই অপ্রতিমের হত্যাকারীরা উপযুক্ত শাস্তি পাক। কিন্তু সেই শাস্তি যেন আসে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যেখানে অভিযুক্তেরও নিজের কথা বলা ও প্রতিরক্ষার সুযোগ থাকে।
ই-মেইল: [email protected], [email protected]