বইটি গ্রামবাংলার প্রকৃতির জীবন্ত চিত্রায়ণ। নদী, খাল, বিল, সবুজ মাঠ, ফসলের খেত, গাছপালা, পাখির ডাক, মেঠোপথ কিংবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা—প্রতিটি বিষয় লেখক এমন মমতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন, যেন পাঠক বইয়ের পৃষ্ঠা ছেড়ে বাস্তবেই কোনো গ্রামীণ জনপদে উপস্থিত হয়েছেন। প্রকৃতি এখানে নিছক সৌন্দর্যের উপাদান, মানুষের জীবন, অনুভূতি ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কাব্যোপন্যাসটির মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে সোজন ও দুলীকে ঘিরে। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের হয়েও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে সমাজের প্রচলিত বিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা যখন অধিক প্রভাব বিস্তার করে, তখন তাদের ভালোবাসাও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। লেখক এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শুধু দুটি মানুষের আবেগ-অনুভূতিই প্রকাশ করেননি; তৎকালীন সমাজব্যবস্থার অসংগতি ও মানুষের তৈরি বিভাজনের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছেন।

বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতির চিত্র। একই গ্রামের দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেওয়া, একে অপরের উৎসব-পার্বণে অংশগ্রহণ, সামাজিক অনুষ্ঠানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এসব বিষয় লেখক অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। কোথাও ধর্মীয় পরিচয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি; মানবিক সম্পর্কই প্রাধান্য পেয়েছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজের এমন কিছু চিত্র পাঠককে ভাবিয়ে তোলে, যেখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। এক সম্প্রদায়ের আনন্দে অন্য সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ কিংবা একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক সম্প্রীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে।

বর্তমান সময়ের সামাজিক বাস্তবতায়ও এর বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া, পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা কিংবা বিভাজনের প্রবণতা আমাদের সমাজে বিভিন্ন সময়ে পরিলক্ষিত হয়। অথচ জসীমউদ্‌দীন তাঁর এই সাহিত্যকর্মে এমন এক গ্রামীণ সমাজের চিত্র এঁকেছেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্কও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। মানুষের মধ্যে বিভেদের স্থান নেই। সম্প্রীতি ও সহমর্মিতাই যে সমাজকে সুন্দর করে তুলতে পারে, বইটি যেন সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লেখকের ভাষা, ছন্দ, উপমা ও আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার কাব্যোপন্যাসটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। গ্রামীণ মানুষের মুখের ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতিকে সাহিত্যে তুলে ধরার ক্ষেত্রে জসীমউদ্‌দীনের দক্ষতা অনস্বীকার্য। তাঁর লেখায় কৃত্রিমতার চেয়ে স্বাভাবিকতা বেশি, আর সেই স্বাভাবিকতাই পাঠকের সঙ্গে কাহিনির এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করে।