নারী ও শিশু সুরক্ষার কথা বলে সাইবার আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও রাজনীতিকরা। তাদের অভিযোগ, সুরক্ষার আড়ালে মানহানি, গুজব ও অপতথ্যের মতো অস্পষ্ট শব্দ যুক্ত করে আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) মতোই ভিন্নমত দমনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এতে গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত ‘বাকস্বাধীনতা প্রশ্নে সংশোধিত সাইবার আইন কতটুকু বিতর্কিত, কতটুকু ডিএসএর প্রতিচ্ছবি ?’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংগঠনটির সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। নাবিলা ইদ্রিস বলেন, বিদ্যমান আইনেই যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন ও শিশু নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিধান রয়েছে। অথচ প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ভুক্তভোগী নারীদের ছবি দ্রুত অপসারণের মতো জরুরি সুরক্ষার বিষয় না এনে রাজনীতিবিদদের কার্টুন আঁকার ক্ষেত্রে শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নারী-শিশু সুরক্ষার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অস্পষ্ট আইনি ধারায় মামলা করে পরে রিমান্ড ও হয়রানির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। নতুন আইনেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি গোলাম মাহফুজ বলেন, সাইবার হয়রানি বা ডার্ক ওয়েবে তথ্য ফাঁস থেকে নাগরিকদের সুরক্ষায় স্পষ্ট বিধান না থাকলেও মানহানির ধারা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে অভিযোগের সুযোগ বাড়বে এবং তদন্তের নামে ফোন বা সার্ভার জব্দের ঘটনা ঘটতে পারে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত করা উচিত নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একই ধরনের মামলা ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তা গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। অল্টারনেটিভের সংগঠক তাজনুভা জাবীন বলেন, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে ভিন্নমত দমনের আইন বাতিলের অঙ্গীকার ছিল। অথচ প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্যের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। তিনি সংশোধনী প্রত্যাহারের দাবি জানান।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) গবেষণা উপদেষ্টা ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, ১৩ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র আট কার্যদিবস গণপরামর্শের জন্য দেওয়া হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ আইনের ক্ষেত্রে এ সময় যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিকভাবে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের বদলে দেওয়ানি প্রতিকারের দিকে নেওয়ার প্রবণতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন বলেন, দমনমূলক আইন দিয়ে ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; প্রয়োজন সুশাসন।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]