ইউরোপের বহু শহর দেখেছি; কিন্তু আকাশ থেকে সারায়েভোকে প্রথম দেখার অনুভূতিটি আলাদা। আধুনিক নগরায়ণ এখানে প্রকৃতিকে গ্রাস করেনি, বরং পাহাড়, নদী আর মানুষের বসতি মিলে শহরটিকে যেন একটি প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের মধ্যে গড়ে তুলেছে। পাহাড়ের মাঝখানে গভীর এক উপত্যকা। সেই উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলেছে মিলিয়াতস্কা নদী, আর নদীর দুই পাশ থেকে পাহাড়ের ঢালে ঢালে উঠে গেছে ঘরবাড়ি।

আরেকটি দৃশ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ল—পাহাড়ের কোলে কোলে অসংখ্য মসজিদের সরু মিনার। মূলত এক মিনারবিশিষ্ট মসজিদ। অটোমান স্থাপত্যে দুই বা তার বেশি (চার বা ছয়টি) মিনারবিশিষ্ট মসজিদগুলোকে বলা হতো ‘সেলাতিন মসজিদ’ বা রাজকীয় মসজিদ বা সুলতানি মসজিদ।

বলকান অঞ্চলের অটোমান স্থাপত্যের মসজিদগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ সাদৃশ্য আছে। বসনিয়ার মসজিদগুলোতে অটোমান স্থাপত্যের সেই পরিচিত ছাপ—কেন্দ্রীয় গম্বুজ, সরু মিনার, সংযত অলংকরণ—বারবার ফিরে আসে। উপমহাদেশের মসজিদগুলোর স্থাপত্যে বলকানের মতো এ রকম অভিন্নতা দেখা যায় না।

বিমান থেকে দেখা সেই মিনারগুলো যেন দূর থেকেই জানিয়ে দিচ্ছিল—এটি ইউরোপের আর দশটি রাজধানীর মতো শুধু একটি আধুনিক শহর নয়; এর আত্মার গভীরে কয়েক শতাব্দীর মুসলিম-অটোমান ইতিহাসও রয়েছে।

সারায়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ইতিহাসের সাক্ষী বিমানবন্দরটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ১৯৯২–৯৫ সালের সারায়েভো অবরোধ। বিমানবন্দরের রানওয়ে পেরিয়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরে রানওয়ের নিচ দিয়ে খনন করা সারায়েভো টানেল অবরুদ্ধ শহরের সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে। যুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট বিমানবন্দরটি আবার বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

ট্যাক্সির জানালা দিয়ে সারায়েভোকে আরও কাছ থেকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, কিছু শহরকে বুঝতে হলে তার স্থানীয় রাস্তা দিয়ে যেতে হয়, হাইওয়ে নয়। বিমান থেকে যে পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখেছিলাম, এবার তার সঙ্গে যোগ হলো মানুষের জীবন—রাস্তার পাশে বাড়ি, দোকান, ট্রামলাইন, নদী আর পাহাড়ের গায়ে উঠে যাওয়া বসতি।