‘রক্তগোলাপ’ গল্পটি সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন ১৯৬২-৬৩ সালে। ভাবা যায়! বৈশ্বিক সাহিত্য তখনও ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতার নামই শোনেনি। লাতিন সাহিত্য তখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লেখক, সাহিত্যামোদীদের কাছে নিজেদের তুলে ধরতে শুরু করেনি। স্পেনীয় সাহিত্য ততদিনে অনেক কালজয়ী লেখক এবং রচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু তখনও সার্ভেন্তিস ছাড়া অন্য কেউ সর্বত্র পরিচিত এবং সর্বব্যাপী প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠেননি। সেই সময় বাংলা ভূখণ্ডে এক যুবক লেখক লিখে ফেললেন ‘রক্তগোলাপ’। একটি কথা খুব প্রচারিত হয়, বাংলাদেশি লেখকরা বিদেশি লেখক-কবি, সাহিত্যতত্ত্ব, পশ্চিমা সাহিত্য আন্দোলনকে চেনেন পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমে। কথাটি খুব যে মিথ্যা তা-ও বলা যাবে না। সরাসরি পশ্চিমা সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ বাংলাদেশের লেখক-কবিদের ক্ষেত্রে খুব বেশি আগের কথা নয়। এখনও পশ্চিমের, আফ্রিকার, লাতিনের অনেক লেখকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে ভায়া পশ্চিমবঙ্গ হয়ে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের লেখক-কবিরা অনেকেই মৌলিক সৃজনের ক্ষেত্রে কলকাতার তুলনায় এগিয়ে যান। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সালে! কলকাতা এমন গল্প লেখার কথা ভেবে উঠতেই পারেনি। পশ্চিমও পারেনি। তারা তখন অ্যাবসার্ডিটির মৌতাতে আচ্ছন্ন। সেই সময় লেখা হলো ‘রক্তগোলাপ’, যার তুলনীয় গল্প সমকালীন বিশ্বেও কোথাও ছিল না। এখনকার যে জাদুবাস্তবতা-বিশেষজ্ঞরা বড়জোর শহীদুল জহিরের নামটি উচ্চারণ করেন, তাদের কল্পনার সীমাতেই এখনও আসেনি সৈয়দ শামসুল হকের ‘রক্তগোলাপ’। এই বিশেষজ্ঞদের দীনতার কারণ ঔপনিবেশিকতায় আচ্ছন্নতা। বাংলাদেশের কোনো লেখক যে পৃথিবীর সমকালীনদের তুলনায় এগিয়ে থাকা গল্প লিখে ফেলতে পারেন তা তাদের চিন্তাতে কিছুতেই প্রবেশাধিকার পায় না। এই বিশেষজ্ঞদের জন্য করুণা। ০২. আমাদের এই নিবন্ধের লক্ষ্য অবশ্য ‘রক্তগোলাপ’-এর বিশ্লেষণ নয়। সৈয়দ শামসুল হকেরই অন্য একটি গল্প ‘মানুষ’। রবীন্দ্রনাথের একটি কথা বাঙালি সমাজে আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে। তা হচ্ছে ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। আপ্তবাক্য মানে হচ্ছে সমাজ সর্বজনীনভাবে যে বাক্যকে সর্বাংশে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। এই বাক্যের বিরোধিতা করা তো দূরের কথা, সেটিকে বিশ্লেষণের চেষ্টা দেখলেই বাঙালি শিক্ষিত সমাজ রে রে করে ছুটে আসে। শুধু এই ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো আপ্তবাক্যের বেলাতেই একই রকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু মানুষ কি অবিমিশ্র বিশ্বাসযোগ্য প্রাণী? দার্শনিকদের মধ্যেও মানুষের প্রকৃতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত আছে। এক ধরনের দর্শনে দাবি করা হয় মানুষ জন্মগতভাবে ভালো। তাদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ সমাজ, পরিস্থিতি, প্রাণধারণ, সঙ্গদোষের কারণে খারাপ হয়ে যায়। তবে তারা মানবজাতির মূলধারা নয়। সমাজেরও মূলধারা নয়। সমাজ এবং রাষ্ট্রে অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হলে এরা বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠে আবার মূলধারা অর্থাৎ ভালো মানুষের দলে ফিরে আসবে। আরেক ধরনের দর্শনে দাবি করা হয় মানুষ জন্মগতভাবে খারাপ। তারা খারাপ কাজই করতে চায়। তারা সুযোগের অভাবে অথবা শাস্তির ভয়ে ভালো হওয়ার ভান করে। কিন্তু নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির কথা কখনোই বিস্মৃত হয় না। সুযোগ পেলেই তারা অন্য মানুষের ক্ষতি করে, অন্য মানুষের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্দ্বিধায় হত্যা করে। আমাদের সাহিত্যিক সমাজেও একই ধরনের বিভক্তি দেখা যায়। সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্পে দেখা যায় দাঙ্গাপিড়িত সময়ে একজন মুসলমানি পোশাক পরা মানুষ এবং আরেকজন হিন্দুয়ানি পোশাক পরা মানুষ একে অপরের অচেনা, রাস্তার দাঙ্গা দেখে একটি সাময়িক আশ্রয়ের খোঁজ পেলেও কিছুতেই একত্রে সেখানে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না। ভাবছে, কাছে পেলে অপরজন হয়তো তাঁকে হত্যা করবে বিধর্মী বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সেই আশ্রয়ে প্রবেশ করতেই হয়। প্রথমে দুজনেই সংকুচিত। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের কথোপকথন শুরু হয়। দেখা যায় দুজনেই ধর্মীয় বিভেদকে অন্যায্য মনে করে। এই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাকে ভ্রাতৃঘাতী বলে অভিহিত করে। এই দাঙ্গা কোনো সমস্যার সমাধান করবে না, বরং সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে বিশ্বাস করে। তারা এ পর্যন্তও স্বীকার করে যে অন্যের ধর্মকে হেয় চোখে দেখা ঠিক নয়। তাদের মধ্যে নিবিড় যৌথ মনোভাব সৃষ্টি হয়। আন্তরিকতা গড়ে ওঠে। বাইরের দাঙ্গা প্রশমিত হলে নিরাপদ বোধ করে দুজনেই আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারা দুজন দুদিকে যাবে। তাই বিদায় নেওয়ার সময় পরস্পরের নিরাপত্তা কামনা করে। তাদের বিদায়কালীন অভিন্ন আন্তরিক শব্দ– আদাব। আবার সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর গল্পে দেখান অভিন্ন বিপদে মানুষ গোষ্ঠদ্বন্দ্ব ভুলে যায়। একত্র হয়। পরস্পরকে সর্বাত্ম সাহায্য করে। কিন্তু বিপদ কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মধ্যে বিভেদ আগের চেয়েও বেশি ঘৃণা নিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘মানুষ’ গল্পটি কোন দর্শনকে ধারণ করেছে? ‘মানুষ’ কি নিতান্ত একটি ব্যক্তি মনস্তত্ত্বনির্ভর গল্প? এক কথায় এটাকে তা বলা যাবে না। কিন্তু এখানে সামাজিক মনস্তত্ত্ব ঠিকই ফুটে উঠেছে। সেই কারণেই উপরোক্ত দুই দর্শনের একটি বর্গে পড়ে যায় গল্পটি। সিনেমা দেখে ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়ানো এক যুবক হঠাৎ আসা তীব্র ঝড়ের কবলে পড়ে আশ্রয় নিয়েছে একটি বাড়ির বারান্দায়। তার মনে পড়ছে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী ঝড়টির কথা। যেবার ‘এ শহরের ওপর দিয়ে সাইক্লোন হয়ে গেল, একটি জাহাজকে উড়িয়ে নিয়ে ডাঙায় তুলে রাখল, বিষাক্ত সাপ আর মানুষ বন্যার মুখে পাশাপাশি আশ্রয় নিল, কিন্তু সাপ কাটল না মানুষকে।’ একটু পড়েই যুবক দেখল আরেকজন মানুষও এসে আশ্রয় নিয়েছে সেই বারান্দাতেই। তাকে দেখামাত্র আধো অন্ধকারেও চিনতে পারল যুবক। এ সেই লোকটা যে তার অবর্ণনীয় দুরবস্থার জন্য দায়ী। তারপর কিছুক্ষণ যুবকের মধ্যে মানসিক দোলাচল। সে এখন লোকটার ওপর প্রতিশোধ নেবে নাকি তাকে এই দুর্যোগের মধ্যে নিজের মতোই আক্রান্ত ভেবে পাশাপাশি অবস্থান করবে। ইতোমধ্যে অপর লোকটিও চিনে ফেলেছে যুবকটিকে। সে ঝড়ের চেয়েও বেশি ভয় পেতে শুরু করেছে যুবককে। যুবক তাকে অভয় দেওয়ার জন্য কিছু বলতে চাইলে সে আরও সিঁটিয়ে গেল বারান্দার আরেক দিকে। যুবক তার দিকে এক পা এগিয়ে কথা বলতে চাইলে লোকটা পালানোর ভঙ্গিতে বারান্দা থেকে ঝড়-জলের মধ্যেই নিচে নেমে পড়ল। ‘সে দৌড়ুতে লাগল। আর তাকে দেখা গেল না। আবার আমি তাকে ফেরাবার জন্য চিৎকার করে ডাকলাম। বাতাস সে চিৎকার ফিরিয়ে আনল আমার কাছেই। ঝড়ের মধ্যে হয়তো একটা উড়ে আসা টিনে তার মৃত্যু হতে পারে। আমার বুক হিম হয়ে গেল। আকুল হয়ে আরেকবার ডাকলাম আমি। কিন্তু কোথাও আর তাকে দেখতে পেলাম না। গলাটা ধরে এলো আমার। আমি তো মানুষ, তাই সে আমাকে বিশ্বাস করতে পারল না।’ বিষাক্ত সাপ আর মানুষ বন্যার মধ্যে একই আশ্রয়ে বাস করতে পারে। সাপ তখন কামড়ায় না মানুষকে। মানুষ তখন বিষাক্ত সাপকেও বিশ্বাস করতে পারে। তাকে তাড়িয়ে না দিয়ে অথবা তার কাছ থেকে পালিয়ে না গিয়ে একই সঙ্গে বন্যা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু মানুষ তার সঙ্গে পূর্ব-শত্রুতায় জড়িত মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না। এমনকি সেই মুহূর্তটিতেও, যখন দুজনেরই প্রাণ বাঁচানোর জন্য অভিন্ন আশ্রয় গ্রহণ করার প্রয়োজন। এমন নিরেট সত্য গ্রহণ করতে আমাদের মন সায় দেয় না। কিন্তু সত্য তো সত্যই। সৈয়দ শামসুল হক সত্যকে তুলে আনতে পেরেছেন শিল্পের মোড়কে। কারণ শিল্প ছিল তার কাছে সত্যের মতোই সহজাত। সৈয়দ শামসুল হক নিজস্ব একটি সাহিত্যদর্শন নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন। এবং সেই দর্শনের সঙ্গে মিল রেখে তিনি নিজের জন্য পরিপূর্ণ নিজস্ব একটি সাহিত্যভাষাও নির্মাণ করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই কারণে সৈয়দ হকের সব রচনাই তাঁর নিজস্বতা চিহ্নিত রচনা। তাঁর কোনো রচনাই যেমন কবিতা, যেমন গল্প, যেমন উপন্যাস, যেমন কাব্যনাটক, যেমন মঞ্চনাটক, যেমন বিশেষ ধরনের প্রবন্ধসমূহ— নিছক কব্জির কলাকৌশলমাত্র নয়। বরং সব সৃষ্টিই এক-একটি অসাধারণ কারুকৃতি। সৃজনউৎসবে মেতে ওঠা মননফসল। যেহেতু কথাসাহিত্য হচ্ছে প্রত্যক্ষত সবচেয়ে জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যমাধ্যম, তাই অনেকেই লেখকের গল্প-উপন্যাসের মধ্যে ফুটে ওঠা দর্শনকেই লেখকের জীবনদর্শন বলে ভেবে নিতে অভ্যস্ত। আমরা যদি সেই সিদ্ধান্ত পর্যন্ত যেতে না-ও চাই, তবু সৈয়দ হক সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, জীবনকে দেখার যে বিশেষ ধরনটিকে তিনি আবিষ্কার করেছেন, তাঁর এই গল্পটিতেও সেই দর্শনের ছায়াপাত ঘটেছে। প্রচ্ছন্নে নয়, প্রবলভাবেই। আজকের বাংলাদেশে শিশুহত্যা, শিশু অপহরণ, বিনা কারণে মব সৃষ্টি করে মানুষ হত্যা করা, মানুষকে হেয় করা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সব প্রগতিশীল সংগ্রামের মাধ্যমে জাতি যা অর্জন করেছিল– সেগুলো সবই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশেরই বিশাল একটি গোষ্ঠীর মানুষ। সেই বাংলাদেশের মানুষকে আপনি কোন দৃষ্টিতে ধারণ করবেন তার একটি সূত্র ধরিয়ে দিয়েছে সৈয়দ হকের ‘মানুষ’ গল্পটি। কিন্তু গল্পের কাজ যেহেতু শেষ কথাটি বলে দেওয়া নয়, কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়, তাই পাঠককেই যাচাই করে নিতে হবে তিনি কোন ধরনের মানুষ।

ই-মেইল: [email protected], [email protected]