মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি আয়োজনসব প্রিয় শিক্ষার্থীর মধ্যে কেউ কেউ থেকে যায় মনের গহিনেলেখা: আজমীরা খানমপ্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯: ৪৬ ২০০৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জীবন শুরু হয়। প্রায় ২০ বছরের শিক্ষকতার জীবনে বহু শিক্ষার্থীর সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু কিছু কিছু নাম হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে চিরতরে। ‘শিক্ষকতা এক মহান পেশা’—এই পেশা যে কতটা সম্মানের ও ভালোবাসার, তা শিক্ষক না হলে বুঝতেই পারতাম না। আমি যখন শিক্ষার্থী ছিলাম অনেক শিক্ষককে খুব ভালো লাগত। কিন্তু নিজেই যখন সেই ভালো লাগার–ভালোবাসার স্থানটি পেলাম, তখন শিক্ষকতার স্বাদ যেন পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারলাম।

অনেক শিক্ষার্থী আমার অনেক কাছে এসেছে, তাদের স্মৃতি চোখের সামনে হৃদয়ের আঙিনায় সব সময় ঝড় তোলে। কিন্তু এই অনেক ভালো লাগার শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন যে আমার হৃদয়ের খানিকা জায়গা দখল করে নিয়েছে, তার সম্পর্কে কিছু না লিখতে পারলে মনে হয় খানিকটা প্রাপ্তির অপূর্ণতার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছি। হ্যাঁ, বলছি, সেই প্রিয় নাম সাবিকুন নাহার অহনা। বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-তে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছে। একজন শিক্ষার্থী একজন শিক্ষকের পুরো মনটা দখল করার যে কীভাবে ক্ষমতা রাখে, তারই গল্প আজ শোনাব।

২০১৬ সালের শুরুতে সে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তখন তাকে আমি ওভাবে চিনতাম না, সবার মধ্যে সে–ও একজন ছিল। শ্যামবর্ণের মিষ্টি চেহারা, চুপচাপ স্বভাবের ছিল। নিজের কথাও ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারত না। অন্য মেয়েদের থেকে অনেকটা শান্ত স্বভাবের ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে দিন যায় মাস যায় বছরও যায়, দেখি সে আমার সান্নিধ্যে আসতে খুব পছন্দ করছে। যেকোনো বিষয় বা অন্য কোনো অজুহাতে আমার সঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগে। তার প্রতি আমার একটু প্রশংসা, তার দিকে তাকানো, তার প্রতি খেয়াল রাখা—এসব যেন তার জীবনের অমূল্য প্রাপ্তিতে পরিণত হতে লাগল। এভাবে ধীরে ধীরে বুঝে ফেললাম—সে আমাকে কতটা পছন্দ করে। আমার যেকোনো কথা ডিকশনারির মতো সংগ্রহ করে রেখেছে। আমার জন্মদিন, আমার বিশেষ কোনো দিন—সব যেন তার ছকে বাঁধা। মাঝেমধ্যে মনের কথা মুখে না প্রকাশ করতে পেরে অসংখ্য চিরকুটও চিঠির মাধ্যমে আমাকে জানান দিয়েছে কতই না নকশা ও ডিজাইন করে। তখন আমি বুঝতে পারি, ও আমাকে কতটা ভালোবাসে, কতটা শ্রদ্ধা করে। আমি তখন আরও বুঝতে পারলাম, আমার সান্নিধ্য তাকে ভালো লাগায় এবং আমার যেকোনো কথায় সে অনুপ্রাণিত হয় এবং তার জীবনও বদলে যায়। মেডিক্যালে চান্স না পেয়ে সে যেভাবে ভেঙে পড়েছিল, আমি তাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করি। তখন থেকে আমি তাকে আরও সুযোগ করে দিই।

আস্তে আস্তে সে যেকোনো বিষয় শেয়ার করার জন্য আমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। আমারও আস্তে আস্তে তার প্রতি ভালো লাগা বাড়তে থাকে। অহনা যেভাবে ভালোবাসার বান্ধনে আমাকে জড়িয়ে ফেলেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার পরিবারের থেকেও তার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান সম্পূর্ণ আলাদা। এত আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান আমি পেয়েছি তার কাছ থেকে, যা সত্যিই বিরল আর চিরদিন মনে রাখার মতো। যখনই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে, হাতে তার ফুল থাকবেই। এ পর্যন্ত আমাকে সে যত ফুল দিয়েছে, তা দিয়ে একটি দোকান সাজিয়ে ফেলা সম্ভব। গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, রংগন, লিলি, বকুল, কৃষ্ণচূড়া ও ঋতুভেদে যত ফুল পাওয়া যায় আরও সব নাম না জানা হরেক রকম ফুল। তার জন্য আমার ফুলদানি কখনোই খালি থাকে না। একটি শুকাতে না শুকাতে আরেকটি হাজির। এই ভালোবাসায় যে সুখ আমি পেয়েছি, তাতে শিক্ষক হিসেবে সত্যি নিজেকে আমি ধন্য মনে করি। এখন তার আর আমার সম্পর্ক শুধু একজন শিক্ষক–শিক্ষার্থীর মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। সম্পর্কটা যেন সব সম্পর্কের সমীকরণকে হার মানাবে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত কথা হয়, যেকোনো বিষয় শেয়ার করা হয়। সে যেন এক আত্মার ভিন্ন এক নিবিড় বন্ধন। সত্যি শিক্ষকতা জীবনে এমন প্রাপ্তি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। জীবনের হিসাব-নিকাশ আর তখন থাকে না। ক্লাসরুমের পাঠদানের বাহিরে ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন মায়ার বন্ধনে আর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা যেন শিক্ষকতার জীবনে দিয়েছে পূর্ণতা।

লেখা: আজমীরা খানম, সিনিয়র শিক্ষক, বীণাপানি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ