বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬Loginপ্রচ্ছদআয়োজনদূর পরবাসসফলতাপাঠকসংস্কৃতিভ্রমণছবি দূর পরবাস ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়!’মো ইয়াকুব আলী অস্ট্রেলিয়াপ্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬: ৪৭ মারজুক রাসেল লিখেছিলেন—
সারা জীবন প্রেম–ভালোবাসা থেকে নিজেকে সংগত কারণেই সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। কৈশোরের যে বয়সে মনের পাতায় রং লাগে, চোখে লাগে ঘোর, আর বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি তৈরি হয় কুসুম কুসুম ভালোলাগা, তখন আমাকে জোর করে এসব অনুভূতি সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। কারণ, আমার দাদির একটা প্রবাদ ছিল— ‘ভাতের কুড়কুড়ি কি যৌবনের কুড়কুড়ি।’ সহজ কথায়, পেটে ভাত থাকলে সবই ভালো লাগে, কিন্তু পেটে ক্ষুধা থাকলে আর কিছুই ভালো লাগে না।
পদ্মার পাড়ে জন্ম নেওয়া আমার জীবনটাও যেন নদীরই প্রতিচ্ছবি। পদ্মা যেমন শীতকালে শুকিয়ে যায়, আমার জীবনটাও কৈশোরের সময়ে একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। পেটে ভাতের সংস্থান নেই। পরনের কাপড়ে শত তালি। এক পোশাকেই বছর পার করতে হয়। এর পাশাপাশি পড়াশোনাটা ছিল গরিবের ‘ঘোড়া রোগ’। তবু কোনো রকম চালিয়ে নিচ্ছিলাম। পাড়ার বন্ধুরা বিভিন্ন মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে শুরু করল এবং নগদে ‘ছ্যাঁকামাইসিন’ খেয়ে ‘ব্যাকা’ হয়ে গেল। পাশাপাশি পড়াশোনা উঠল চাঙে। কিন্তু আমাকে জোর করে এই বিলাসিতা থেকে মুক্ত রাখতে হলো। কারণ, পড়াশোনা করে নিজের এবং পরিবারের অভাব দূর করতে হবে। আমি তাই পাড়ার মোড়ের দোকানে বসে নচিকেতার গান শুনি আর নিজেকে নিজেই প্রেরণা জোগাই—
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যখন মনের রং আরও একটু গাঢ় হলো, তখন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আরও বেশি ভালোলাগা তৈরি হলো। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় সেটাকেও চেপে রাখতে হলো। এরপর বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধুরা সবাই মোটামুটি প্রেম করতে শুরু করল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে আমরা তখন চাইলেই রাজত্বসহ রাজকন্যার বাবা রাজি। কিন্তু আত্মসম্মানের গর্বে সেদিকে আর পা বাড়ালাম না। বন্ধুরা যখন বিকেলে নিজেদের প্রেয়সীকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়, আমি তখন ঢাকা শহরের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত হেঁটে টিউশনি করে ক্লান্ত হয়ে হলে ফিরি। নিজের পড়াশোনার খরচ, ছোট ভাইদের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি সংসারেও কিছুটা সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তাই প্রেম বিষয়টা ঠিক যেন আমার করে ওঠা হলো না।
অবশ্য বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রেম নিয়ে আমার কিছু তত্ত্বও ছিল। আমি প্রেমিকদের বলতাম, পোষা কুকুর। আর কুকুরের মালিক হচ্ছে প্রেমিকা। পোষা কুকুর যেমন মনিবভক্ত হয়, প্রেমিকও ঠিক তেমন। মালিকের দরকারের সময় তুতু করে ডাকলেই লেজ নাড়তে নাড়তে বেচারা কুকুর হাজির। আবার কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে গেলেই মালিক কষে পেছনে একটা লাথি দেন। লাথি খেয়ে ব্যথায় কুঁই কুঁই করতে করতে ফিরে আসে। এরপর আবারও মালিক তুতু করে ডাকলে আবারও হাজির হয়। এমন একটা অশোভন কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল। উপরন্তু হলের রুমমেট তানভীরের এহেন কুকুর স্বভাবের কর্মকাণ্ড প্রেম সম্বন্ধে মনে আরও বিতৃষ্ণা তৈরি করেছিল। আমাদের সহপাঠী এক মেয়ে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ–সুবিধা নিয়েছিল। এরপর যখন সে সেই মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল, মেয়েটা তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিয়েছিল—
‘আমি তোমাকে ভালো বন্ধু বলেই জানতাম, সেই তুমিও আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে!’