মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬Loginবন্ধুদের লেখাকার্যক্রমফিচারখেলাক্যারিয়ারমনোবন্ধুফটো ফিচারবন্ধুসভা সম্পর্কে ফিচারপাহাড়ের পথে একদিন (তৃতীয় পর্ব) সংগ্রাম থেকে উত্তরণের স্বপ্নলেখা: রাশেদ খাঁনপ্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ০০ পাহাড়ের সৌন্দর্য।আমরা যেখানে সামান্য অসুস্থ হলেই কাছের হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাওয়ার সুযোগ পাই, সেখানে একটি জীবন বাঁচানোর জন্য একজন মানুষকে কাঁধে করে কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়। এরপর নদীপথে আরও কয়েক ঘণ্টার যাত্রা। পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে এমন অসংখ্য কষ্টের গল্প লুকিয়ে আছে, যা একজন পর্যটক কয়েক দিনের ভ্রমণে সহজে বুঝতে পারে না।

শুভকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বড় হয়ে কী হতে চায়। উত্তরে বলেছিল, ডাক্তার হতে চায়। তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডাক্তার হতে চাও কেন?’ তার উত্তর ছিল, নিজের বোন যেভাবে চিকিৎসার অভাবে সময়মতো সেবা না পেয়ে মারা গেছে, সে চায় ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে অন্য কারও জীবন বাঁচাতে।

একজন ক্লাস টেনে পড়া পাহাড়ি কিশোরের এই স্বপ্ন আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। হয়তো তার বোনকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই শোকই তার ভেতরে নতুন একটি স্বপ্ন তৈরি করেছে, অন্যের জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, শুভর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন শুধু তার ব্যক্তিগত নয়; এই স্বপ্ন পাহাড়ের মানুষের বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

জিন্নাপাড়া ও আশপাশের পাহাড়ি জনপদের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাঁরা এই দেশেরই অংশ। তাঁদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ও জীবনধারা বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আর পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক যায়। পর্যটনকে কেন্দ্র করেই পাহাড়ের অনেক মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা, খাবারের ব্যবস্থা করা, পথ দেখানো, গাইড হিসেবে কাজ করা—এসবই তাঁদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে এসেছি মানুষের গল্প নিয়ে।আমরা যারা পাহাড়ে ভ্রমণ করতে যাই, আমাদের নিরাপদে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে শুভর মতো অসংখ্য পাহাড়ি তরুণ কাজ করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। যে পাহাড় শীতকালে সুন্দর ও শান্ত মনে হয়, বর্ষায় তা হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। পাহাড়ধস, দুর্গম রাস্তা ও সাঙ্গু নদীর তীব্র স্রোতের কারণে অনেক অঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও স্থবির হয়ে পড়ে। এই সময়ে পর্যটনও সীমিত বা বন্ধ থাকে। ফলে যাঁদের জীবিকা মূলত পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়েন।

এ কারণে পাহাড়ি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত ধাত্রীবিদ্যা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় করা যেতে পারে। দুর্গম এলাকাগুলোতে কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার। বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনী বা অন্যান্য সংস্থার উদ্যোগে পাহাড়ি এলাকায় মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালিত হয়। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও নিয়মিত করা গেলে দুর্গম এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।