পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে শিশু নিখোঁজের ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা নিজেরাই ফেরত এসেছে। এখনও ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ। নিখোঁজ শিশুরা বেঁচে আছে কিনা, সে তথ্য জানা নেই কারও। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, উভয় খতিয়ানে মেয়েশিশু আর ছেলেশিশুর কোনো আলাদা হিসাব নেই। নিখোঁজের বিষয়টির গভীরে যেতে হলে বয়স ও জেন্ডারভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। ----------------------------------------------------

আশির দশকে বাংলাদেশে ভিসিআর ছিল বেশ ব্যয়বহুল, সীমিতসংখ্যক পরিবারের বিনোদন সামগ্রী। অনেকে ভাড়া করে বাড়িতে এনে পরিবার-পরিজন নিয়ে উপভোগ করতেন অনেক আগের দেখা অথবা দুর্লভ সিনেমা। যারা পারতেন না তারা ছুটতেন পুরান ঢাকার অলিগলিতে। সেখানে বন্ধ ঘরের অন্ধকারে চালু হয়েছিল ভিসিআর শো ব্যবসা। বেআইনি সেসব বিনা করের প্রদর্শনীতে গন্দমের টান ছিল। তরুণ কিশোরদের টানত খুব। খেলাধুলা, লাইব্রেরি, ব্যায়ামাগার, পড়াশোনা, কোচিং বাদ দিয়ে কিশোর তরুণরা দলে দলে ছুটত সেখানে। আইনসিদ্ধ না হওয়ায় পুলিশের দাবড়ানি দাবড়ানি খেলা চলত। বোঝাপড়া না হলে ভিসিআর জব্দ আর দর্শকদের চালান হতো থানায়। মা-বাবা ছুটতেন সন্তানদের মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে। নিষিদ্ধ প্রদর্শনী থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তারের সচিত্র খবর আসত খবরের পাতায়।

এই সময় এক চাকুরে মা থাকতেন সরকারি এক রুমের ফ্ল্যাটে কিশোর ছেলেকে নিয়ে। ছেলে যাতে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বাড়িতে থাকে তাই মা তাকে একটা ভিসিআর কিনে দেন। শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হয়নি ছেলেটির। পুরান ঢাকার অলিগলি যাওয়া বন্ধ হলেও, চেনা বন্ধুরা তাকে খুন করে ভিসিআরের জন্য তারই ফ্ল্যাটে। বেশকিছু দিন রক্তহিম করা সে খুনের খবর নিয়ে তোলপাড় চলে; পত্রিকার কাটতি বাড়ে। সন্তানহারা মাকে নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করে রাষ্ট্রকে তুলোধুনা করে নানা লেখা ছাপা হতে থাকে। তারপর আমাদের গোল্ডফিশ মেমরি সব ভুলে যায়। হত্যা রহস্যের কোনো কূলকিনারা হয় না।

কুমিল্লার ঘটনা উপরোল্লিখিত হতভাগ্য কিশোরটির কথা বারবার মনে পড়ায় নানাজনের কাছে ঘটনার শেষটুকু জানতে চেয়ে বুঝলাম, সবাই বেমালুম ভুলে গেছে সেই আস্থা হারানোর ঘটনা। ভিসিআর, আইফোন দিয়ে এসব ঘটনার বিচার করলে বিশ্বাস আর আস্থা হারানোর সংকটটা নজরের বাইরে থেকে যায়।

মালিবাগের এক দাদু তাঁর নাতিকে এক শখের বাইসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। মালিবাগ মাটির মসজিদ এলাকার রাস্তার গলিগুলোতে এখনও শিশুরা বিকেলে হাঁটাহাঁটি করতে পারে; সাইকেল চালাতে পারে। নাতির সাইকেলটি একদিন সন্ধ্যায় হারিয়ে যায়–তার এক বিশ্বাসী বন্ধু একটু চালিয়ে দেখি বলে নিয়ে আর ফিরে আসেনি। সাইকেল হারানোর চেয়ে বিশ্বাস হারানোর শোক থেকে শকে চলে যায় শিশুটি। সে কি আর কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারবে? এ দেশে শিশুকে শখ করে গহনা পরানোর খেসারত দিতে হয় হরহামেশা। কানের দুলের আর্থিক মূল্য খুব কম হলেও শিশুদের প্রাণ যাচ্ছে যখন-তখন। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, নরসিংদীর সায়মা জাহানের ঘটনায় শিশুটির দুলের ওজন ছিল মাত্র এক আনা তিন রতি; প্রতিবেশী শেলী বেগমের বিরুদ্ধে দুলের লোভে হত্যার অভিযোগ ওঠে এবং পরে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির কথা প্রকাশিত হয়।

ঘটনাগুলোকে শুধু ‘সোনার দুলের জন্য শিশু হত্যা’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। বরং ঘটনাগুলোতে বারবার দেখা যায়– পরিচিত ব্যক্তি >> শিশুর আস্থা >> একা করে নেওয়া >> ছোট গহনা বা সম্পদের লোভ >> হত্যা >> লাশ গোপন করার চেষ্টা। এটি শিশু সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রচলিত সতর্কবার্তা ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যাবে না’– এ ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় কাজ করে না।